১০:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ: বিপদে দেশের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

The gallery was not found!

আন্তর্জাতিক নৌপথের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালি ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নতুন করে আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর এই নৌপথটিই ছিল বাংলাদেশের অন্যতম ভরসা। কিন্তু লোহিত সাগরের কৌশলগত পেরিম দ্বীপসহ উপকূলীয় মোখা বন্দর হুতিদের দখলে চলে যাওয়ায় এ সমুদ্রপথেও ঝুঁকি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানির সংকট তীব্র হবে, অন্যদিকে রপ্তানির লিড টাইম ও পরিবহন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

আমদানিতে দীর্ঘ ট্রানজিট ও বিপুল ব্যয়

প্রণালির নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে শিপিং লাইনগুলো সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরের সরাসরি পথ বাদ দিয়ে আফ্রিকার ‘উত্তমাশা অন্তরিপ’ ঘুরে ভূমধ্যসাগরীয় দীর্ঘ রুটে জাহাজ পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি আমদানিতে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেলবাহী ট্যাংকার ‘এমটি নিনেমিয়া’ সম্প্রতি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। যেখানে সরাসরি ১৬ দিনের মতো সময় লাগার কথা, সেখানে এ যাত্রায় সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন।

শিপিং এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘ ঘুরপথে পণ্য পরিবহন করায় প্রতিটি ট্যাংকারে পরিচালন ও বিমা খরচ বাবদ বাড়তি প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, যার বড় অংশই টানতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

হুমকির মুখে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাব আল-মানদেব ও সুয়েজ খালনির্ভর অঞ্চলগুলোর (ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো ইত্যাদি) সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি ডলার (৪৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার)। এটি দেশের সর্বমোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

বিশেষ করে রপ্তানি খাতের জন্য এই পথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশই যায় এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। পাশাপাশি তুরস্কের পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকার তুলাসহ মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আসে এই পথে। হুতিদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এই সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

পোশাক খাতে ‘লিড টাইম’ ও খরচের চাপ

জাহাজ সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরে বিকল্প দীর্ঘপথে পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিন সময় বেশি লাগছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, বিদেশি ক্রেতারা প্রাথমিকভাবে শিপিংয়ের অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করলেও দিন শেষে সেই ব্যয় ও দরকষাকষির চাপ স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের ওপরই এসে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতাদের হাতে তৈরি পোশাক সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সার্বিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সংকট দীর্ঘায়িত হলে যেসব প্রতিযোগী দেশ বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানি বাজারে পিছিয়ে পড়বে। সময় ও খরচ বাড়ার কারণে দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে।”

রিজার্ভ ও দেশীয় জ্বালানি খাতে উত্তাপ

জ্বালানির উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসের সরবরাহ কমে লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি বৈদেশীক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই সংকটের হাত থেকে সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা পেতে সরকারকে অবিলম্বে জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস খুঁজে বের করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তি বা সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

হুতির সামরিক মহড়া ঘিরে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা

Business Times24

বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ: বিপদে দেশের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

Update Time : ১১:২৪:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক নৌপথের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালি ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নতুন করে আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর এই নৌপথটিই ছিল বাংলাদেশের অন্যতম ভরসা। কিন্তু লোহিত সাগরের কৌশলগত পেরিম দ্বীপসহ উপকূলীয় মোখা বন্দর হুতিদের দখলে চলে যাওয়ায় এ সমুদ্রপথেও ঝুঁকি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে একদিকে যেমন জ্বালানি আমদানির সংকট তীব্র হবে, অন্যদিকে রপ্তানির লিড টাইম ও পরিবহন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

আমদানিতে দীর্ঘ ট্রানজিট ও বিপুল ব্যয়

প্রণালির নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে শিপিং লাইনগুলো সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরের সরাসরি পথ বাদ দিয়ে আফ্রিকার ‘উত্তমাশা অন্তরিপ’ ঘুরে ভূমধ্যসাগরীয় দীর্ঘ রুটে জাহাজ পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি আমদানিতে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেলবাহী ট্যাংকার ‘এমটি নিনেমিয়া’ সম্প্রতি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। যেখানে সরাসরি ১৬ দিনের মতো সময় লাগার কথা, সেখানে এ যাত্রায় সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন।

শিপিং এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘ ঘুরপথে পণ্য পরিবহন করায় প্রতিটি ট্যাংকারে পরিচালন ও বিমা খরচ বাবদ বাড়তি প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, যার বড় অংশই টানতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।

হুমকির মুখে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাব আল-মানদেব ও সুয়েজ খালনির্ভর অঞ্চলগুলোর (ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো ইত্যাদি) সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি ডলার (৪৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার)। এটি দেশের সর্বমোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

বিশেষ করে রপ্তানি খাতের জন্য এই পথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশই যায় এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। পাশাপাশি তুরস্কের পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকার তুলাসহ মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ আসে এই পথে। হুতিদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এই সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

পোশাক খাতে ‘লিড টাইম’ ও খরচের চাপ

জাহাজ সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরে বিকল্প দীর্ঘপথে পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিন সময় বেশি লাগছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, বিদেশি ক্রেতারা প্রাথমিকভাবে শিপিংয়ের অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধ করলেও দিন শেষে সেই ব্যয় ও দরকষাকষির চাপ স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের ওপরই এসে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হলে নির্দিষ্ট সময়ে ক্রেতাদের হাতে তৈরি পোশাক সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সার্বিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সংকট দীর্ঘায়িত হলে যেসব প্রতিযোগী দেশ বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ রপ্তানি বাজারে পিছিয়ে পড়বে। সময় ও খরচ বাড়ার কারণে দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে।”

রিজার্ভ ও দেশীয় জ্বালানি খাতে উত্তাপ

জ্বালানির উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসের সরবরাহ কমে লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি বৈদেশীক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই সংকটের হাত থেকে সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা পেতে সরকারকে অবিলম্বে জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস খুঁজে বের করতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তি বা সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে।