০৭:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

হরমুজ দেখিয়ে দিল মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা

The gallery was not found!

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত প্রতিরোধ ও অবিরাম তৎপরতা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনীর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু সামরিক শক্তি বা বোমা হামলা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে কোনো জটিল ভূরাজনৈতিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহণ করা মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যে পথে যেত, সেই হরমুজ প্রণালিই এখন দেখিয়ে দিচ্ছে— আমেরিকার সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই রাজনৈতিকভাবে জয়ী হওয়া নয়।

খামেনিকে হত্যার জবাবে ইরান আত্মসমর্পণ করেনি; বরং বিদেশি জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের কোনো জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী পালটা-পালটি হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। বিপরীতে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা ও সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অবরোধ কখনো কঠোর হয়েছে, কখনো শিথিল হয়েছে, আবারও আরোপ করা হয়েছে।

এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, কয়েক ডজন জাহাজকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এতে ইরানের দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে যায়নি।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধের চাপ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। ‘মিলিটারি টাইমস’, ‘টাস্ক অ্যান্ড পারপাস’ ও ‘নেভি টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’-এর কিছু নাবিক টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কেউ কেউ খাবারের সংকট, দূষিত পানি, নষ্ট পানির ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গায় ছত্রাক জন্মানোর মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে গেছে। তবে এগুলো দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিনের এই সংঘাত মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কখন শেষ হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধের কারণে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যও ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইরান এই সংকটকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করছে। মে মাসে তেহরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে দাবি করে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। যদিও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রণালিটির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত এবং মাসকাট ইরানের এই দাবিকে সমর্থন করেনি।

হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের দাবিও কঠোর—নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা। এসব দাবি এমন কোনো দেশের অবস্থান নয়, যে দেশ শিগগিরই ভেঙে পড়ার পথে। বরং তেহরানের হিসাব হলো, তাদের প্রতিপক্ষই আগে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে।

এটাই ওয়াশিংটনের মূল সংকট। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও এমন একটি জলপথ পুনরায় খুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র, যেটি যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ চলাচলের সাক্ষী ছিল। সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে যতটা কার্যকর, আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান আদায়ে ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। তারা একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব হরমুজ সংকটের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আনুষ্ঠানিক করেছে।

একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান, যা মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থলভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালি সংকটের ছয় মাস পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—আমেরিকার শক্তি বা প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।

রাজনৈতিক সমাধানের স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ফল হয় উলটো। অবরোধ টেকসই হয় না, মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর চাপ বাড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বুঝতে শুরু করে যে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

দেশীয় ফ্যাশনে আস্থার প্রতীক ফিট এলিগ্যান্স, নেতৃত্বে সাফল্যের নতুন দিগন্ত

Business Times24

হরমুজ দেখিয়ে দিল মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা

Update Time : ০৪:৩৩:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত প্রতিরোধ ও অবিরাম তৎপরতা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনীর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু সামরিক শক্তি বা বোমা হামলা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে কোনো জটিল ভূরাজনৈতিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহণ করা মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যে পথে যেত, সেই হরমুজ প্রণালিই এখন দেখিয়ে দিচ্ছে— আমেরিকার সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই রাজনৈতিকভাবে জয়ী হওয়া নয়।

খামেনিকে হত্যার জবাবে ইরান আত্মসমর্পণ করেনি; বরং বিদেশি জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের কোনো জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী পালটা-পালটি হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। বিপরীতে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা ও সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অবরোধ কখনো কঠোর হয়েছে, কখনো শিথিল হয়েছে, আবারও আরোপ করা হয়েছে।

এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, কয়েক ডজন জাহাজকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এতে ইরানের দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে যায়নি।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধের চাপ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। ‘মিলিটারি টাইমস’, ‘টাস্ক অ্যান্ড পারপাস’ ও ‘নেভি টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’-এর কিছু নাবিক টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কেউ কেউ খাবারের সংকট, দূষিত পানি, নষ্ট পানির ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গায় ছত্রাক জন্মানোর মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে গেছে। তবে এগুলো দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিনের এই সংঘাত মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কখন শেষ হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধের কারণে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যও ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইরান এই সংকটকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করছে। মে মাসে তেহরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে দাবি করে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। যদিও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রণালিটির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত এবং মাসকাট ইরানের এই দাবিকে সমর্থন করেনি।

হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের দাবিও কঠোর—নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা। এসব দাবি এমন কোনো দেশের অবস্থান নয়, যে দেশ শিগগিরই ভেঙে পড়ার পথে। বরং তেহরানের হিসাব হলো, তাদের প্রতিপক্ষই আগে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে।

এটাই ওয়াশিংটনের মূল সংকট। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও এমন একটি জলপথ পুনরায় খুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র, যেটি যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ চলাচলের সাক্ষী ছিল। সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে যতটা কার্যকর, আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান আদায়ে ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। তারা একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব হরমুজ সংকটের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আনুষ্ঠানিক করেছে।

একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান, যা মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থলভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালি সংকটের ছয় মাস পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—আমেরিকার শক্তি বা প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।

রাজনৈতিক সমাধানের স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ফল হয় উলটো। অবরোধ টেকসই হয় না, মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর চাপ বাড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বুঝতে শুরু করে যে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।