০৯:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকটে থাকা ব্যবসায় ঋণ দিতে ২৮ হাজার কোটি টাকা চায় ৩৮ ব্যাংক

The gallery was not found!

বন্ধ ও সংকটে পড়া কারখানা সচল করার লক্ষ্যে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে থাকা দীর্ঘদিনের মতবিরোধের অবসান হয়েছে।

এই প্যাকেজের অংশ হিসেবে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুদের হার নিয়ে যে জটিলতা ছিল, তা নিরসন হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে ঋণ বিতরণের পথ সুগম হয়েছে। ইতোমধ্যে সংকটে থাকা ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণ প্রদানের জন্য ৩৮টি ব্যাংক প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার চাহিদা জমা দিয়েছে।

সুদের হার ও নতুন নীতিমালা

পূর্বের প্রস্তাবিত ৯ শতাংশ সুদের হার নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতবিরোধ ছিল। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তার ‘পলিসি রেট’-এর সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করবে। বর্তমানে পলিসি রেট ৯.৫% হওয়ায় এই তহবিলের বর্তমান সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১০%।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নীতি সুদহার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই তহবিলের খরচও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা হবে। ঋণ বিতরণের কাঠামো অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯% হারে সুদ বা মুনাফা আদায় করতে পারবে (স্টার্টআপের ক্ষেত্রে এটি সর্বনিম্ন ৪% পর্যন্ত হতে পারে)। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% চার্জ নেবে এবং ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যকার সুদের যে ব্যবধান, তা সরকার বাজেটে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করবে।

ঋণ বিতরণ ও মেয়াদের রূপরেখা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ঋণ এককালীন নয়, বরং তিন বছর মেয়াদে পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর সাথে ঋণ চাহিদা থাকা ব্যাংকগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে এই বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী তারল্য সংকটের যে আশঙ্কা ছিল, তা নিরসন হয়েছে।

৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ কাঠামো 

ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (৪১,০০০ কোটি টাকা): এর মধ্যে ২০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০,০০০ কোটি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য ৫,০০০ কোটি, কৃষি-হাবের জন্য ৩,০০০ কোটি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের জন্য ৩,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি গ্যারান্টিভুক্ত তহবিল (১৯,০০০ কোটি টাকা): এই অংশটি বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি সরবরাহ করবে। পিকেএসএফ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মস্থন ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

ব্যাংকারদের প্রযুক্তিগত উদ্বেগ

সুদ হার নির্ধারণের বিরোধ মিটে গেলেও, ব্যাংকাররা এখনো কিছু বিষয়ে চিন্তিত। প্রথমত, এই ঋণের বিপরীতে কোনো ‘লিকুইডিটি ব্যাকস্টপ’ বা নগদ সহায়তা সুবিধা নেই; অর্থাৎ সংকট দেখা দিলে এই তহবিলের অংশ রেপো অর্থায়নের জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো তাদের হিসাবের খাতায় এই তহবিলকে কীভাবে নথিভুক্ত করবে (যেমন—প্লেসমেন্ট, বন্ড নাকি বিনিয়োগ) তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

মূল লক্ষ্য ও প্রত্যাশা

এই প্রণোদনা প্যাকেজটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিগত কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদনমুখী শিল্পে গতি সঞ্চার করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

সংকটে থাকা ব্যবসায় ঋণ দিতে ২৮ হাজার কোটি টাকা চায় ৩৮ ব্যাংক

Update Time : ০৫:৪৬:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

বন্ধ ও সংকটে পড়া কারখানা সচল করার লক্ষ্যে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে থাকা দীর্ঘদিনের মতবিরোধের অবসান হয়েছে।

এই প্যাকেজের অংশ হিসেবে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের সুদের হার নিয়ে যে জটিলতা ছিল, তা নিরসন হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে ঋণ বিতরণের পথ সুগম হয়েছে। ইতোমধ্যে সংকটে থাকা ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণ প্রদানের জন্য ৩৮টি ব্যাংক প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার চাহিদা জমা দিয়েছে।

সুদের হার ও নতুন নীতিমালা

পূর্বের প্রস্তাবিত ৯ শতাংশ সুদের হার নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতবিরোধ ছিল। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তার ‘পলিসি রেট’-এর সঙ্গে ৫০ বেসিস পয়েন্ট যোগ করে তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করবে। বর্তমানে পলিসি রেট ৯.৫% হওয়ায় এই তহবিলের বর্তমান সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১০%।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নীতি সুদহার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই তহবিলের খরচও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা হবে। ঋণ বিতরণের কাঠামো অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯% হারে সুদ বা মুনাফা আদায় করতে পারবে (স্টার্টআপের ক্ষেত্রে এটি সর্বনিম্ন ৪% পর্যন্ত হতে পারে)। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% চার্জ নেবে এবং ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যকার সুদের যে ব্যবধান, তা সরকার বাজেটে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করবে।

ঋণ বিতরণ ও মেয়াদের রূপরেখা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ঋণ এককালীন নয়, বরং তিন বছর মেয়াদে পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর সাথে ঋণ চাহিদা থাকা ব্যাংকগুলোর সমন্বয় ঘটিয়ে এই বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী তারল্য সংকটের যে আশঙ্কা ছিল, তা নিরসন হয়েছে।

৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ কাঠামো 

ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন তহবিল (৪১,০০০ কোটি টাকা): এর মধ্যে ২০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য ১০,০০০ কোটি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য ৫,০০০ কোটি, কৃষি-হাবের জন্য ৩,০০০ কোটি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের জন্য ৩,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি গ্যারান্টিভুক্ত তহবিল (১৯,০০০ কোটি টাকা): এই অংশটি বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি সরবরাহ করবে। পিকেএসএফ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মস্থন ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

ব্যাংকারদের প্রযুক্তিগত উদ্বেগ

সুদ হার নির্ধারণের বিরোধ মিটে গেলেও, ব্যাংকাররা এখনো কিছু বিষয়ে চিন্তিত। প্রথমত, এই ঋণের বিপরীতে কোনো ‘লিকুইডিটি ব্যাকস্টপ’ বা নগদ সহায়তা সুবিধা নেই; অর্থাৎ সংকট দেখা দিলে এই তহবিলের অংশ রেপো অর্থায়নের জামানত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো তাদের হিসাবের খাতায় এই তহবিলকে কীভাবে নথিভুক্ত করবে (যেমন—প্লেসমেন্ট, বন্ড নাকি বিনিয়োগ) তা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

মূল লক্ষ্য ও প্রত্যাশা

এই প্রণোদনা প্যাকেজটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিগত কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদনমুখী শিল্পে গতি সঞ্চার করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।