ভোজ্যতেল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করার পেছনে দায়ী ক্ষতিকর ‘ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড’ (টিএফএ) নিয়ন্ত্রণে শেষমেশ কঠোর মানদণ্ড জারি করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। নতুন প্রণীত ‘বাংলাদেশ মান’ (বিডিএস) অনুযায়ী, ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য শিল্পোৎপাদিত খাবারে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা হবে মোট ফ্যাটের মাত্র ২ শতাংশ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) তেজগাঁওয়ের বিএসটিআই প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এক উচ্চপর্যায়ের অংশীজন সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নতুন ঘোষিত এই মানদণ্ডের আওতায় থাকবে ভোজ্যতেল, বনস্পতি (ডালডা), লাচ্ছাসেমাই, ডেকোরেটেড কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট, চিপস ও চানাচুরের মতো বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্য।
কী এই ট্রান্স ফ্যাট: শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট মূলত তৈরি হয় যখন তরল উদ্ভিজ্জ তেলের ভেতর উচ্চ তাপে হাইড্রোজেন চালনা করে সেটিকে জমাট চর্বিতে রূপান্তর করা হয় (যা বাজারে বনস্পতি বা ডালডা নামে পরিচিত)। খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখতে এবং স্বাদ মচমচে করতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে এই চর্বির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে এই ফ্যাট শরীরে প্রবেশ করলে তা রক্তনালীর ভেতরের দেয়ালে চর্বির আস্তরণ জমায়। এতে রক্তপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
সভায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিএসটিআই ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধি ছাড়াও দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বসুন্ধরা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ এবং বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের প্রতিনিধিরা।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা সভায় আশ্বাস দেন, বিএসটিআই-এর এই নতুন মানদণ্ড মেনে চলতে তারা নিজেদের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত রূপান্তর আনবেন। বিশেষ করে প্যাকেটজাত তেল ও বাণিজ্যিক চর্বি প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেন।
বিএসটিআই-এর এই পদক্ষেপকে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য ও খাদ্য বিজ্ঞানীরা।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের এপিডিমিওলজি ও পাবলিক হেলথ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, দেশে এখন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মানুষদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত খাবারে অনিয়ন্ত্রিত ট্রান্স ফ্যাট এর অন্যতম একটি কারণ। বিএসটিআই-এর পক্ষ থেকে এই ২ শতাংশের বাধ্যবাধকতা প্রণয়ন একটি ইতিবাচক নীতিগত পদক্ষেপ। তবে এটি কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে তা পরীক্ষার কঠোরতার ওপর।
একই বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল আলীম জানান, বড় কারখানাগুলো দ্রুত এই মানদণ্ডে অভ্যস্ত হতে পারলেও আসল চ্যালেঞ্জ হবে ছোট ও মাঝারি বেকারিগুলোতে এটি প্রয়োগ করা। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁয় একই ভোজ্যতেল বারবার ফুটিয়ে রান্নার যে চর্চা রয়েছে, সেটাও বন্ধে কঠোর তদারকি দরকার।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসটিআই-এর নির্ধারিত এই নিয়মটি সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত নজর দিতে হবে। সেগুলো হলো-বাজার থেকে নিয়মিত খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা জোরদার করা। প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের গায়ে ট্রান্স ফ্যাটের উপস্থিতি লেখা বাধ্যবাধকতা করা। ক্ষুদ্র বেকারি ও সাধারণ খাবার দোকানগুলোকে অনিরাপদ চর্বি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 

























