১১:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাহাজ ভাঙা কারখানায় মৃত্যু: ক্ষতিপূরণেই কি সমাধান?

The gallery was not found!

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গেল ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরোনো এলএনজি জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো প্রশ্ন—বাংলাদেশ কেন বিশ্বের বড় জাহাজভাঙা কেন্দ্র, আর এত আইন, সনদ ও তদারকির পরও কেন শ্রমিকের মৃত্যু থামছে না?

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় জাহাজের বদ্ধ অংশে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্ঘটনার এক মাস আগেই নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। ফেব্রুয়ারি, মে ও জুনে একাধিক নোটিশ দেওয়ার পরও নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

শিল্পটি কেন বাংলাদেশে এলো

জাহাজভাঙার শিল্প সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসেনি। বিশ শতকের বড় সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পুরোনো জাহাজ ভাঙা হতো। পরে কেন্দ্র যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে। আশির দশক থেকে এসব দেশে শ্রমের দাম বাড়তে থাকলে ব্যবসার বড় অংশ সরে আসে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে।

ইউরোপীয় কমিশনের গবেষণায়ও এই স্থানান্তরের পেছনে কম শ্রমব্যয় এবং কম খরচের ‘বিচিং’ পদ্ধতিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপে বিপজ্জনক বর্জ্য সরানো, নিরাপদ অবকাঠামো এবং শ্রমিক সুরক্ষার খরচও তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি সুবিধা যোগ হয়েছে। সীতাকুণ্ডের দীর্ঘ, কম ঢালু জোয়ার-ভাটার সৈকতে উচ্চ জোয়ারে বড় জাহাজ তীরে তুলে আনা যায়। রয়েছে তুলনামূলক সস্তা শ্রম, স্ক্র্যাপ ইস্পাতের বিশাল স্থানীয় বাজার, কাছাকাছি রিরোলিং মিল এবং সহজ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ফলে একটি জাহাজের ইস্পাত থেকে শুরু করে ইঞ্জিন, পাম্প, তার কিংবা আসবাব পর্যন্ত দ্রুত বাজারে বিক্রি করা সম্ভব।

এই অর্থনীতিই বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮০ শতাংশ হয়েছে ভারত, বাংলাদেশ ও তুরস্কে।

কিন্তু ‘কম খরচের’ এই মডেলের অস্বস্তিকর দিকও আছে। নিরাপত্তা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো খরচ ব্যবসা বহন না করলে সেই খরচের দায় বহন করে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের স্বাস্থ্য, জীবন ও স্থানীয় পরিবেশ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার ইতিহাসে এই বাস্তবতাও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

২০২২ থেকে একই এলাকায় বারবার মৃত্যু

সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাস আশ্বস্ত করার মতো নয়। ২০২২ সালের ৪ জুন বিএম কনটেইনার ডিপোর আগুন ও বিস্ফোরণে ৫১ জন নিহত হন। সরকারি তদন্তে অনিরাপদ রাসায়নিক সংরক্ষণ, দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার কথা উঠে এলেও পরে পুলিশের তদন্তে আট অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করা হয় এবং আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।

এর ৯ মাস পর, ২০২৩ সালের মার্চে সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণে সাতজন মারা যান। মালিক ও কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে মামলা হয়। ওই ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের ১৫টি অক্সিজেন কারখানা পরিদর্শন করে ১৩টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল। ২৪টি অফডক কনটেইনার ডিপোর মধ্যেও অধিকাংশে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত ছিল না।

জাহাজভাঙা শিল্পের নিজস্ব পরিসংখ্যানও একই সংকেত দেয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সাতজন করে এবং ২০২৫ সালে চারজন শ্রমিক মারা যান। চলতি ২০২৬ সালে ফেরদৌস স্টিলের নয়জনসহ মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ১২জনে দাঁড়িয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে চলতি বছরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ৮৪টি দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু ও ৮১ জন আহত হয়েছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা, আলোচনায় যুদ্ধ-জলবায়ু ও নিরাপত্তা

Business Times24

জাহাজ ভাঙা কারখানায় মৃত্যু: ক্ষতিপূরণেই কি সমাধান?

Update Time : ০১:০৭:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গেল ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরোনো এলএনজি জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো প্রশ্ন—বাংলাদেশ কেন বিশ্বের বড় জাহাজভাঙা কেন্দ্র, আর এত আইন, সনদ ও তদারকির পরও কেন শ্রমিকের মৃত্যু থামছে না?

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় জাহাজের বদ্ধ অংশে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্ঘটনার এক মাস আগেই নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। ফেব্রুয়ারি, মে ও জুনে একাধিক নোটিশ দেওয়ার পরও নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

শিল্পটি কেন বাংলাদেশে এলো

জাহাজভাঙার শিল্প সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসেনি। বিশ শতকের বড় সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পুরোনো জাহাজ ভাঙা হতো। পরে কেন্দ্র যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে। আশির দশক থেকে এসব দেশে শ্রমের দাম বাড়তে থাকলে ব্যবসার বড় অংশ সরে আসে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে।

ইউরোপীয় কমিশনের গবেষণায়ও এই স্থানান্তরের পেছনে কম শ্রমব্যয় এবং কম খরচের ‘বিচিং’ পদ্ধতিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপে বিপজ্জনক বর্জ্য সরানো, নিরাপদ অবকাঠামো এবং শ্রমিক সুরক্ষার খরচও তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি সুবিধা যোগ হয়েছে। সীতাকুণ্ডের দীর্ঘ, কম ঢালু জোয়ার-ভাটার সৈকতে উচ্চ জোয়ারে বড় জাহাজ তীরে তুলে আনা যায়। রয়েছে তুলনামূলক সস্তা শ্রম, স্ক্র্যাপ ইস্পাতের বিশাল স্থানীয় বাজার, কাছাকাছি রিরোলিং মিল এবং সহজ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ফলে একটি জাহাজের ইস্পাত থেকে শুরু করে ইঞ্জিন, পাম্প, তার কিংবা আসবাব পর্যন্ত দ্রুত বাজারে বিক্রি করা সম্ভব।

এই অর্থনীতিই বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮০ শতাংশ হয়েছে ভারত, বাংলাদেশ ও তুরস্কে।

কিন্তু ‘কম খরচের’ এই মডেলের অস্বস্তিকর দিকও আছে। নিরাপত্তা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো খরচ ব্যবসা বহন না করলে সেই খরচের দায় বহন করে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের স্বাস্থ্য, জীবন ও স্থানীয় পরিবেশ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার ইতিহাসে এই বাস্তবতাও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

২০২২ থেকে একই এলাকায় বারবার মৃত্যু

সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাস আশ্বস্ত করার মতো নয়। ২০২২ সালের ৪ জুন বিএম কনটেইনার ডিপোর আগুন ও বিস্ফোরণে ৫১ জন নিহত হন। সরকারি তদন্তে অনিরাপদ রাসায়নিক সংরক্ষণ, দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার কথা উঠে এলেও পরে পুলিশের তদন্তে আট অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করা হয় এবং আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি বন্ধ করে দেয়।

এর ৯ মাস পর, ২০২৩ সালের মার্চে সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণে সাতজন মারা যান। মালিক ও কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে মামলা হয়। ওই ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের ১৫টি অক্সিজেন কারখানা পরিদর্শন করে ১৩টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছিল। ২৪টি অফডক কনটেইনার ডিপোর মধ্যেও অধিকাংশে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত ছিল না।

জাহাজভাঙা শিল্পের নিজস্ব পরিসংখ্যানও একই সংকেত দেয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সাতজন করে এবং ২০২৫ সালে চারজন শ্রমিক মারা যান। চলতি ২০২৬ সালে ফেরদৌস স্টিলের নয়জনসহ মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ১২জনে দাঁড়িয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে চলতি বছরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ৮৪টি দুর্ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু ও ৮১ জন আহত হয়েছেন।