০৯:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাটকল থেকে বৈশ্বিক কেন্দ্র: আদমজী ইপিজেডের ১.৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন

The gallery was not found!

একসময় যেখানে কেবল ঐতিহ্যবাহী পাটের তৈরি চট আর সুতার রাজত্ব ছিল, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সেই জমিতেই এখন তৈরি হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ফরমাল স্যুট, বিলাসবহুল ব্রাইডাল গাউন, রোবোটিকস প্রযুক্তির সেফটি বুট এবং হাই-টেক অটোমোটিভ পার্টস।

বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজী জুট মিলের ধ্বংসাবশেষের ওপর ২০০৬ সালে মাথা তুলে দাঁড়ানো ‘আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল’ (ইপিজেড) আজ দেশের বৈচিত্র্যময় শিল্পায়নের অন্যতম শক্ত ভিত্তি।

সাম্প্রতিক অর্থবছরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ পোশাক পণ্যের বাইরে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে এই শিল্পাঞ্চলটি।

অর্জনের খতিয়ান ও অর্থনৈতিক চিত্র

রপ্তানির বিশ্বজয়: প্রাথমিক নকশায় এই ইপিজেড থেকে বছরে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু সব হিসাব উল্টে দিয়ে গত কয়েক অর্থবছরে এটি ১ বিলিয়ন ডলারের ঘর টপকে গেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.১৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। সূচনা থেকে এ পর্যন্ত এই ইপিজেড থেকে দেশে এসেছে মোট ১১.১১২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

বিনিয়োগের পাহাড়: দেশের অন্যতম এই আধুনিক ইপিজেডে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৪৭ মিলিয়ন ডলারে।

বিশাল কর্মসংস্থান: ২৯২ একর আয়তনের সংরক্ষিত এলাকাটিতে বর্তমানে ৪৭টি সচল কারখানায় সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৭৬ হাজার ২৭ জন মানুষের।

প্রথাগত পোশাকের বাইরে: হাই-ভ্যালু ও হাই-টেক পণ্যের দাপট

টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, ভ্যান হিউসেনের মতো গ্লোবাল ফ্যাশন জায়ান্টদের নিয়মিত সংগ্রহের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিশেষায়িত বাজারে আদমজীর নিয়ন্ত্রণ জোরদার হচ্ছে:

রোমানিয়া-বাংলাদেশের যৌথ রসায়ন: পুরুষদের বিশ্বমানের ফরমাল স্যুট ও ব্লেজার তৈরিতে প্রায় ৪৫.৯১ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ করেছে ‘ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার’। বর্তমানে তাদের রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭.৮৮ মিলিয়ন ডলারে।

হাই-টেক অটোমোটিভ সরঞ্জাম: জাপানি কোম্পানি ‘টিএস টেক’ থ্রিডি প্রিন্টিং ও বিশেষ অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বমানের গাড়ির সিট-ট্রিম কভার বানাচ্ছে, যা সরাসরি জাপানের গাড়ি প্রস্তুতকারক কারখানায় পাঠানো হয়।

জার্মান ব্রাইডাল ও গ্ল্যামার ওয়ার: ‘ইউবিএফ ব্রাইডাল’ ৩.৬৬ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে তৈরি করছে অভিজাত ওয়েডিং গাউন, জুয়েলারি ও ইভনিং ড্রেস। এখান থেকে তৈরি পণ্য জার্মান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৩৭টি দেশে—যার গায়ে আঁকা থাকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ গর্বের নাম।

ইউক্রেনের আন্তর্জাতিক মানের সেফটি শু: ‘সুপার প্রোটেকটিভ শুজ’ ইউক্রেনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে সামরিক বুট এবং বিশেষ শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সেফটি জুতা প্রস্তুত করছে, যা উন্নত বিশ্বের বাজারে বেশ সমাদৃত।

সামাজিক উন্নয়ন ও রূপান্তরের গল্প

২০০২ সালে আদমজী জুট মিল যখন লোকসানের বোঝা নিয়ে বন্ধ হয়, তখন হাজার হাজার শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবে চার বছরের ব্যবধানে সেই পরিত্যক্ত জমিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে বেপজা (BEPZA)। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যার শূন্যপ্রায় রপ্তানি (মাত্র ০.২৩ মিলিয়ন ডলার) ছিল, দুই দশকের মাথায় তা আজ সাড়ে পাঁচ হাজার গুণ বেড়েছে।

কারখানাগুলোতে আধুনিক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের পাশাপাশি কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা থাকায় হাজারও নারী নিশ্চিন্তে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন। ফলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মানে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সম্প্রসারণ

আদমজী ইপিজেডের সবকটি প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে বেপজা এলাকাটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে আরও ১০টি নতুন কারখানার অবকাঠামো ও সংযোজন কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

বেপজা কর্তৃপক্ষের আশা, নির্মাণাধীন নতুন ইউনিটগুলো পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে এলে আদমজী ইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি সহজেই ১.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সংখ্যা ১ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

পাটকল থেকে বৈশ্বিক কেন্দ্র: আদমজী ইপিজেডের ১.৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন

Update Time : ১১:৫০:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

একসময় যেখানে কেবল ঐতিহ্যবাহী পাটের তৈরি চট আর সুতার রাজত্ব ছিল, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সেই জমিতেই এখন তৈরি হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের ফরমাল স্যুট, বিলাসবহুল ব্রাইডাল গাউন, রোবোটিকস প্রযুক্তির সেফটি বুট এবং হাই-টেক অটোমোটিভ পার্টস।

বন্ধ হয়ে যাওয়া আদমজী জুট মিলের ধ্বংসাবশেষের ওপর ২০০৬ সালে মাথা তুলে দাঁড়ানো ‘আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল’ (ইপিজেড) আজ দেশের বৈচিত্র্যময় শিল্পায়নের অন্যতম শক্ত ভিত্তি।

সাম্প্রতিক অর্থবছরের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ পোশাক পণ্যের বাইরে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে এই শিল্পাঞ্চলটি।

অর্জনের খতিয়ান ও অর্থনৈতিক চিত্র

রপ্তানির বিশ্বজয়: প্রাথমিক নকশায় এই ইপিজেড থেকে বছরে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু সব হিসাব উল্টে দিয়ে গত কয়েক অর্থবছরে এটি ১ বিলিয়ন ডলারের ঘর টপকে গেছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.১৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। সূচনা থেকে এ পর্যন্ত এই ইপিজেড থেকে দেশে এসেছে মোট ১১.১১২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

বিনিয়োগের পাহাড়: দেশের অন্যতম এই আধুনিক ইপিজেডে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৪৭ মিলিয়ন ডলারে।

বিশাল কর্মসংস্থান: ২৯২ একর আয়তনের সংরক্ষিত এলাকাটিতে বর্তমানে ৪৭টি সচল কারখানায় সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৭৬ হাজার ২৭ জন মানুষের।

প্রথাগত পোশাকের বাইরে: হাই-ভ্যালু ও হাই-টেক পণ্যের দাপট

টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, ভ্যান হিউসেনের মতো গ্লোবাল ফ্যাশন জায়ান্টদের নিয়মিত সংগ্রহের পাশাপাশি বৈশ্বিক বিশেষায়িত বাজারে আদমজীর নিয়ন্ত্রণ জোরদার হচ্ছে:

রোমানিয়া-বাংলাদেশের যৌথ রসায়ন: পুরুষদের বিশ্বমানের ফরমাল স্যুট ও ব্লেজার তৈরিতে প্রায় ৪৫.৯১ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ করেছে ‘ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার’। বর্তমানে তাদের রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭.৮৮ মিলিয়ন ডলারে।

হাই-টেক অটোমোটিভ সরঞ্জাম: জাপানি কোম্পানি ‘টিএস টেক’ থ্রিডি প্রিন্টিং ও বিশেষ অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বমানের গাড়ির সিট-ট্রিম কভার বানাচ্ছে, যা সরাসরি জাপানের গাড়ি প্রস্তুতকারক কারখানায় পাঠানো হয়।

জার্মান ব্রাইডাল ও গ্ল্যামার ওয়ার: ‘ইউবিএফ ব্রাইডাল’ ৩.৬৬ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে তৈরি করছে অভিজাত ওয়েডিং গাউন, জুয়েলারি ও ইভনিং ড্রেস। এখান থেকে তৈরি পণ্য জার্মান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৩৭টি দেশে—যার গায়ে আঁকা থাকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ গর্বের নাম।

ইউক্রেনের আন্তর্জাতিক মানের সেফটি শু: ‘সুপার প্রোটেকটিভ শুজ’ ইউক্রেনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে সামরিক বুট এবং বিশেষ শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সেফটি জুতা প্রস্তুত করছে, যা উন্নত বিশ্বের বাজারে বেশ সমাদৃত।

সামাজিক উন্নয়ন ও রূপান্তরের গল্প

২০০২ সালে আদমজী জুট মিল যখন লোকসানের বোঝা নিয়ে বন্ধ হয়, তখন হাজার হাজার শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তবে চার বছরের ব্যবধানে সেই পরিত্যক্ত জমিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে বেপজা (BEPZA)। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যার শূন্যপ্রায় রপ্তানি (মাত্র ০.২৩ মিলিয়ন ডলার) ছিল, দুই দশকের মাথায় তা আজ সাড়ে পাঁচ হাজার গুণ বেড়েছে।

কারখানাগুলোতে আধুনিক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের পাশাপাশি কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা থাকায় হাজারও নারী নিশ্চিন্তে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাচ্ছেন। ফলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মানে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সম্প্রসারণ

আদমজী ইপিজেডের সবকটি প্লট ইতোমধ্যে বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে বেপজা এলাকাটি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে আরও ১০টি নতুন কারখানার অবকাঠামো ও সংযোজন কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

বেপজা কর্তৃপক্ষের আশা, নির্মাণাধীন নতুন ইউনিটগুলো পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে এলে আদমজী ইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি সহজেই ১.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সংখ্যা ১ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করবে।