একসময় সস্তা পোশাকের জোগান দিয়ে বিশ্ববাজারে যে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ, তা আজ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পোশাকের দাম কমিয়েও রপ্তানিকারকেরা নিজেদের বাজার ধরে রাখতে পারছেন না। অথচ ঠিক একই বাজারে সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম।
তারা তুলনামূলক চড়া দামে পোশাক বিক্রি করেও ক্রেতাদের মন জয় করে চলেছে, যা বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ইউরোপের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয় প্রবণতা দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে যখন পোশাকের চাহিদা সংকুচিত হয়েছে, তখন সব দেশের ওপর তার প্রভাব সমানভাবে পড়েনি। প্রতিযোগী দেশগুলো নিজেদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই পুরনো ধারায় আটকে রয়েছে।
বিশেষ করে পণ্যের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন সুতি বা কটনের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারের তৈরি পোশাকের চাহিদা আকাশচুম্বী।
ভিয়েতনাম সময়মতো এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে নিজেদের জোরদার করেছে। ফলে তারা প্রতি কেজিতে অনেক বেশি মূল্য আদায় করতে পারছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের কারখানাগুলো এখনো মূলত প্রথাগত সুতি পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, যা বাজারে সস্তা পণ্য হিসেবেই মূল্যায়িত হয়।
শুধু পণ্যের ধরন নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিও বাংলাদেশের বাজার দখলের লড়াইকে কঠিন করে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অন্য দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ার পর অনেক ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকছে।
ফলে বাংলাদেশের চিরাচরিত পোশাকের ক্রয়াদেশগুলো ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত হতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এই নতুন সমীকরণ বাংলাদেশের বাজার অংশ কমিয়ে দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের কাঠামোগত এবং জ্বালানি সংকট। আগামী মৌসুমের নতুন ক্রয়াদেশ নেওয়ার এই সংকটময় মুহূর্তে কারখানাগুলো তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে ভুগছে।
নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির অভাবে সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা এই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চান না; ফলে সময়মতো পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা বিকল্প উৎসের সন্ধানে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সস্তা দর দিয়ে বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে অবিলম্বে প্রথাগত ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
উচ্চমূল্যের ও বহুমুখী পোশাক উৎপাদন, কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কারখানার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ইউরোপের বাজারে নিজেদের হারানো অবস্থান ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও বড় ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















