চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, নোঙর করা একটি পুরোনো এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের একদম তলার দিকে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। ফোরম্যানের নেতৃত্বে জাহাজের ট্যাংকের চারপাশ কেটে পুরোপুরি খোলার চেষ্টা করা হলে ভেতরের জমে থাকা তরল বর্জ্য ও অতিরিক্ত বিষাক্ত গ্যাস (যেমন কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেন সালফাইড) ছড়িয়ে পড়ে।
তীব্র অক্সিজেনের অভাবে শ্রমিকরা মুহূর্তেই শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন এবং একের পর এক অচেতন হয়ে পড়েন। প্রথম দুই শ্রমিক জ্ঞান হারালে তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে অন্য শ্রমিক, কাটিং ফোরম্যান এবং মাস্ক পরিহিত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। উদ্ধার করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে বাইরে কাদা-মাটিতে বেহুঁশ হয়ে পড়েন আরেক শ্রমিক। ঘটনাস্থলেই ৫ জন মারা যান।
পরবর্তীতে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৪ জন মারা যান। নিহতদের মধ্যে ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, হাবিবুর রহমান এবং দুই ভাই মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিনের পরিচয় জানা গেছে।
কারখানার অব্যবস্থাপনা ও জরুরি সেবার ঘাটতি
কারখানার শ্রমিকদের অভিযোগ, দুর্ঘটনাকবলিতদের উদ্ধার করার পরও ইয়ার্ডের ভেতরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না।
সময়মতো অক্সিজেন ও সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো অনেকের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। অন্যদিকে স্থানীয় শ্রমিক নেতারা জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ চালানো হচ্ছিল এবং ট্যাংকের ভেতর গ্যাস পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের ঢোকানো হয়েছিল, যা কারখানা কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি।
পূর্ববর্তী নোটিশ ও শ্রম আদালতে মামলা
দুর্ঘটনাটি আকস্মিক হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ উঠে এসেছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) জানায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি নিয়মিত পরিদর্শনে গিয়ে এই শিপইয়ার্ডে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয় এবং নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৪ মে ও ৮ জুন বারবার তাগিদপত্র দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বারবার নির্দেশ অমান্য করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ডিআইএফই পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার। শ্রম আদালতে মামলা চলা সত্ত্বেও কোনো প্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই ইয়ার্ডে কাজ চালানো হচ্ছিল।
পরিদর্শন দলের ওপর হামলা ও তদন্ত
দুর্ঘটনার পর যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর। তবে ডিআইএফই প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ২ জন শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।
ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি বহনকারী জাহাজ কাটার আগে নিয়ম অনুযায়ী সেটিকে পুরোপুরি ‘গ্যাসমুক্ত’ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এর ফলে একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























