০৩:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশি মাছে আগুন, সবজির দামও চড়া

The gallery was not found!

রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রাকৃতিক উৎসের ঘাটতিতে দেশি মাছের সরবরাহ কম থাকায় আকাশচুম্বী দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা।

অন্যদিকে মাছের খাবার ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বাড়ানো হয়েছে চাষের মাছের দামও। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ কেজিতে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে দেশি পাবদা, শিং ও মাগুর বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া টেংরা ও গুলশা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, শোল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং বোয়াল ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আকারভেদে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, কম আয়ের মানুষের ভরসা চাষের মাছের দামও এখন উর্ধ্বমুখী। চাষের রুই প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চাষের কৈ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং চাষের শিং ও মাগুর ৪৫০ থেকে ৬০ টাকা টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামের পাঙাশ ২০০ থেকে ২৮০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে পৌঁছানোয় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বাজারে আসা ক্রেতারা জানান, দেশি মাছ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমনকি আগের মতো অল্প খরচে চাষের মাছ কিনে সংসার চালানোও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

খুচরা ও আড়তদার বিক্রেতারা বলছেন, প্রাকৃতিক উৎসে দেশি মাছের ঘাটতি এবং আড়তেই বেশি দামে বিক্রির কারণে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এছাড়া পশুখাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় খামারিরা চাষের মাছের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাছের পাশাপাশি রাজধানীর কাঁচাবাজারে আমদানির পর কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হলেও অন্যান্য পণ্যে স্বস্তি নেই। বর্ষা ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আলু ও পেঁপে ছাড়া প্রায় সব সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে। বরবটি ১২০, করলা ১৩০, বেগুন ১২০-১৪০, টমেটো ১২০ এবং লাউ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একইভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২১০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। যদিও চাল, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

১. সবজির বাজার বিশ্লেষণ (কেন পেঁপে-আলু ছাড়া সবই ১০০ ছাড়াল?):

প্রতিকূল আবহাওয়া ও উৎপাদন ক্ষতি: কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দেশের মূল সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে খেতের সবজি নষ্ট হয়েছে। গাছের গোড়ায় পানি জমে ফলন ব্যাহত হওয়ায় মোকামগুলোতে সবজির সরবরাহ তলানিতে ঠেকেছে।

পরিবহন ব্যবস্থার স্থবিরতা ও ব্যয়বৃদ্ধি: টানা বর্ষণে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক রাস্তার কন্ডিশন খারাপ হওয়ায় রাজধানীর পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত ট্রাক পৌঁছাতে পারছে না। যানবাহন কম থাকায় ট্রাকভাড়া ট্রিপপ্রতি ৮–১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সরাসরি প্রতি কেজি সবজির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হাতবদল ও আড়ত-খুচরা ব্যবধান: কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বড় পাইকারি আড়ত থেকে পণ্য নামার পর ট্রাকে থাকা অবস্থাতেই ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে ২–৩ বার হাতবদল হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত লাভ ও বর্জ্য লোকসান হিসাবের যুক্তিতে পাইকারি ও খুচরা মূল্যে ২০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে।

২. মাছ ও পোল্ট্রি খাত বিশ্লেষণ:

প্রাকৃতিক উৎসের বিলুপ্তি ও উপাদান সংকট: জলাশয় সংকুচিত হওয়ায় নদী-নালার দেশি মাছের সরবরাহ স্থায়ীভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে চাষের মাছ ও মুরগির ফিশফিড/পোল্ট্রি ফিডের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ এবং খামার পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চরম সংকটে উৎপাদন কমে গেছে।

মূল্যস্ফীতি তথ্যের সাথে বাস্তবের অসংগতি: সরকারি সংস্থা (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পরিসংখ্যান দিলেও বাজারে তার কোনো বাস্তব সুফল ভোক্তা পাচ্ছে না। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও নজরদারির অভাব বাজারে স্থায়ী উচ্চমূল্য ধরে রেখেছে।

৩. উত্তরণের স্থায়ী উপায়:

১. সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ঠিক করা: দেশের প্রধান সবজি হাবগুলো থেকে সরাসরি রাজধানীতে পণ্য আনার সরকারি বা নিবন্ধিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে আড়তের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে।

২. কৃষি উপকরণের ব্যয় কমানো: খামার উপকরণ, বীজ, সার ও ফিডের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়ে কৃষক ও খামারিদের উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

৩. কঠোর ও কার্যকর বাজার তদারকি: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাজার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে পাইকারি থেকে খুচরা—সব ধাপে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

দেশি মাছে আগুন, সবজির দামও চড়া

Update Time : ০৬:০৮:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রাকৃতিক উৎসের ঘাটতিতে দেশি মাছের সরবরাহ কম থাকায় আকাশচুম্বী দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা।

অন্যদিকে মাছের খাবার ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বাড়ানো হয়েছে চাষের মাছের দামও। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ কেজিতে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে দেশি পাবদা, শিং ও মাগুর বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া টেংরা ও গুলশা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, শোল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং বোয়াল ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আকারভেদে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, কম আয়ের মানুষের ভরসা চাষের মাছের দামও এখন উর্ধ্বমুখী। চাষের রুই প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতলা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চাষের কৈ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং চাষের শিং ও মাগুর ৪৫০ থেকে ৬০ টাকা টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামের পাঙাশ ২০০ থেকে ২৮০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে পৌঁছানোয় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বাজারে আসা ক্রেতারা জানান, দেশি মাছ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমনকি আগের মতো অল্প খরচে চাষের মাছ কিনে সংসার চালানোও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

খুচরা ও আড়তদার বিক্রেতারা বলছেন, প্রাকৃতিক উৎসে দেশি মাছের ঘাটতি এবং আড়তেই বেশি দামে বিক্রির কারণে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এছাড়া পশুখাদ্য ও পরিবহন খরচ বাড়ায় খামারিরা চাষের মাছের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাছের পাশাপাশি রাজধানীর কাঁচাবাজারে আমদানির পর কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হলেও অন্যান্য পণ্যে স্বস্তি নেই। বর্ষা ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আলু ও পেঁপে ছাড়া প্রায় সব সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে। বরবটি ১২০, করলা ১৩০, বেগুন ১২০-১৪০, টমেটো ১২০ এবং লাউ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একইভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২১০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকা এবং ডিমের ডজন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। যদিও চাল, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

১. সবজির বাজার বিশ্লেষণ (কেন পেঁপে-আলু ছাড়া সবই ১০০ ছাড়াল?):

প্রতিকূল আবহাওয়া ও উৎপাদন ক্ষতি: কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দেশের মূল সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে খেতের সবজি নষ্ট হয়েছে। গাছের গোড়ায় পানি জমে ফলন ব্যাহত হওয়ায় মোকামগুলোতে সবজির সরবরাহ তলানিতে ঠেকেছে।

পরিবহন ব্যবস্থার স্থবিরতা ও ব্যয়বৃদ্ধি: টানা বর্ষণে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক রাস্তার কন্ডিশন খারাপ হওয়ায় রাজধানীর পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত ট্রাক পৌঁছাতে পারছে না। যানবাহন কম থাকায় ট্রাকভাড়া ট্রিপপ্রতি ৮–১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা সরাসরি প্রতি কেজি সবজির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হাতবদল ও আড়ত-খুচরা ব্যবধান: কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বড় পাইকারি আড়ত থেকে পণ্য নামার পর ট্রাকে থাকা অবস্থাতেই ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে ২–৩ বার হাতবদল হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত লাভ ও বর্জ্য লোকসান হিসাবের যুক্তিতে পাইকারি ও খুচরা মূল্যে ২০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে।

২. মাছ ও পোল্ট্রি খাত বিশ্লেষণ:

প্রাকৃতিক উৎসের বিলুপ্তি ও উপাদান সংকট: জলাশয় সংকুচিত হওয়ায় নদী-নালার দেশি মাছের সরবরাহ স্থায়ীভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে চাষের মাছ ও মুরগির ফিশফিড/পোল্ট্রি ফিডের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ এবং খামার পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চরম সংকটে উৎপাদন কমে গেছে।

মূল্যস্ফীতি তথ্যের সাথে বাস্তবের অসংগতি: সরকারি সংস্থা (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পরিসংখ্যান দিলেও বাজারে তার কোনো বাস্তব সুফল ভোক্তা পাচ্ছে না। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও নজরদারির অভাব বাজারে স্থায়ী উচ্চমূল্য ধরে রেখেছে।

৩. উত্তরণের স্থায়ী উপায়:

১. সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ঠিক করা: দেশের প্রধান সবজি হাবগুলো থেকে সরাসরি রাজধানীতে পণ্য আনার সরকারি বা নিবন্ধিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে আড়তের হাতবদল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে।

২. কৃষি উপকরণের ব্যয় কমানো: খামার উপকরণ, বীজ, সার ও ফিডের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়ে কৃষক ও খামারিদের উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

৩. কঠোর ও কার্যকর বাজার তদারকি: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাজার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে পাইকারি থেকে খুচরা—সব ধাপে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।