অর্থনীতি ডেস্ক, বিজনেস টাইমস ২৪ ঢাকা: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার করা না হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এমনকি মধ্যম মেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঢাকা সফরকারী প্রতিনিধিদল সফর শেষে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা দিয়েছে।
এদিকে, বর্তমান সংকট কাটাতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে আইএমএফ-সমর্থিত নতুন একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ও ঋণ সহায়তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে সংস্থাটি।
তথ্যসংগ্রহমূলক সফর শেষ
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত আইএমএফের স্টাফ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। এটি ছিল মূলত একটি ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ বা তথ্যসংগ্রহমূলক সফর। এই সফরে সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য আকার, ঋণের পরিমাণ এবং এর বিপরীতে কী ধরনের শর্ত বা সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে—তা নিয়ে আগামী মাসগুলোতে উভয় পক্ষের মধ্যে আরও বিস্তারিত ও নীতিগত দরকষাকষি হবে।
অর্থনীতির প্রধান ৩ চ্যালেঞ্জ
আইএমএফ তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি: ১. রাজস্ব সংকট: সীমিত রাজস্ব আদায়ের কারণে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। ২. ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা: ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট কাটেনি। ৩. উচ্চ মূল্যস্ফীতি: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বৈদেশিক খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ
-
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে রাজস্ব আহরণ (ট্যাক্স আদায়) বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। তবে সংস্কারের ফলে যেন দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
-
কঠোর মুদ্রানীতি ও নমনীয় বিনিময় হার: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করতে ‘ক্রলিং পেগ’ ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
-
ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন: দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল একীভূতকরণ বা পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ সমস্যার কার্যকর সমাধান ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
অর্থনীতিবিদদের মত: আইএমএফ-এর এই বার্তা স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে যে, নতুন ঋণ কর্মসূচি পেতে হলে সরকারকে রাজস্ব খাত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ভর্তুকি নীতি এবং মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দৃশ্যমান ও কঠোর সংস্কারের পথেই হাঁটতে হবে। আগামী কয়েক মাসের আলোচনাতেই নির্ধারিত হবে নতুন এই ঋণের ভাগ্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























