০৩:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক বছরে ব্যাংক খাতে লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা

The gallery was not found!

দেশের ব্যাংকিং খাত ২০২৫ সালে নজিরবিহীন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে পুরো ব্যাংকিং খাত রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার নিট লোকসানে পড়েছে। একই সঙ্গে মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ও মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাওয়ায় এ বিপুল লোকসানের চিত্র সামনে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায়। এর পরের বছরই খাতটি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার লোকসানে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ-এএকিউআর) করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এই পর্যালোচনায় কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র উঠে আসে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, আর কয়েকটির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।

তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রমের সময় অতীতেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। ২০০৪ সালে পুরো ব্যাংক খাত ৭৭৬ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। এছাড়া, ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাবে পুরো খাত ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকার লোকসানে পড়ে।

ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১০টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। অন্যদিকে লাভজনক ব্যাংকগুলোর মুনাফা এ ক্ষতির একটি অংশ সমন্বয় করলেও সামগ্রিক লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গত বছর সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ক্ষতির পরিমাণ ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, এক্সিম ব্যাংকের লোকসান ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯২ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

তবে ব্যাংক খাতের নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছে। এর মধ্যে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে শীর্ষে রয়েছে।

দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ বর্তমানে ‘ডিস্ট্রেসড’ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব ঋণ থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ডিস্ট্রেসড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। বাকি অংশ খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ এবং আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা ঋণ নিয়ে গঠিত।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডিস্ট্রেসড ঋণ’-এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। সাধারণভাবে যেসব ঋণ থেকে আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয় না, সেগুলোকে এ শ্রেণিতে ধরা হয়। পুনঃতফসিল করা ঋণের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ হলে তা সাধারণত ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয় না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে ব্লু ইকোনমি: শিক্ষামন্ত্রী

Business Times24

এক বছরে ব্যাংক খাতে লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা

Update Time : ০১:০৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাত ২০২৫ সালে নজিরবিহীন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে পুরো ব্যাংকিং খাত রেকর্ড ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার নিট লোকসানে পড়েছে। একই সঙ্গে মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ও মাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাওয়ায় এ বিপুল লোকসানের চিত্র সামনে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায়। এর পরের বছরই খাতটি ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকার লোকসানে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ-এএকিউআর) করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এই পর্যালোচনায় কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র উঠে আসে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, আর কয়েকটির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।

তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কার্যক্রমের সময় অতীতেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। ২০০৪ সালে পুরো ব্যাংক খাত ৭৭৬ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। এছাড়া, ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাবে পুরো খাত ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকার লোকসানে পড়ে।

ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১০টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। অন্যদিকে লাভজনক ব্যাংকগুলোর মুনাফা এ ক্ষতির একটি অংশ সমন্বয় করলেও সামগ্রিক লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গত বছর সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ক্ষতির পরিমাণ ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, এক্সিম ব্যাংকের লোকসান ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯২ কোটি টাকা লোকসান করেছে।

তবে ব্যাংক খাতের নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছে। এর মধ্যে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে শীর্ষে রয়েছে।

দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংকের মুনাফা ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ বর্তমানে ‘ডিস্ট্রেসড’ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব ঋণ থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ডিস্ট্রেসড ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। বাকি অংশ খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ এবং আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা ঋণ নিয়ে গঠিত।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ডিস্ট্রেসড ঋণ’-এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। সাধারণভাবে যেসব ঋণ থেকে আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হয় না, সেগুলোকে এ শ্রেণিতে ধরা হয়। পুনঃতফসিল করা ঋণের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ হলে তা সাধারণত ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে বিবেচিত হয় না।