গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সংকটে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কারখানা সাময়িক বন্ধ, কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন ক্রয়াদেশ ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় সম্প্রতি অন্তত ২ হাজার ৬০২ শ্রমিককে সাময়িকভাবে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে প্রায় ৪৫০টি ডাইং কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকশ পোশাক ও নিটওয়্যার কারখানাও উৎপাদন সাময়িক বন্ধ করেছে এবং শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। ময়মনসিংহে অন্তত ২০টি কারখানা শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠিয়েছে। চট্টগ্রামে জ্বালানি সংকটে প্রায় ৫০টি কারখানা স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫৩০ শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭ হাজার ৮৬২ শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি নাসির উদ্দিনের দাবি, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে অন্তত ১৫২টি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র ও কূপ থেকে বর্তমানে গড়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া যাচ্ছে। আমদানি করা এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে আরও ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সব মিলিয়ে দৈনিক সরবরাহ দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং মহেশখালীর উপকূলে একটি এফএসআরইউতে আগুনের ঘটনায় সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আমদানিনির্ভরতা বড় কারণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত ২৫৩টি গ্যাসকূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি উৎপাদনে রয়েছে। বিভিন্ন কারণে বন্ধ বা স্থগিত রয়েছে ৯৮টি কূপ। এসবের মধ্যে ৬৭টি কূপ ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে পুনরায় উৎপাদনে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, প্রয়োজনীয় ওয়ার্কওভার ও পুনঃখনন করা হলে বন্ধ কূপগুলো থেকে প্রতিদিন আরও ২২০ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধানেও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঘাটতি
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার ৩০০ থেকে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে দৈনিক ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট।
এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানার উৎপাদনে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন—দুই সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে শিল্প উদ্যোক্তাদের।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, সরবরাহে বিঘ্ন ও আমদানিতে সাময়িক বাধা মোকাবিলায় তেল ও কয়লার কৌশলগত মজুত পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। দেশে ভারী জ্বালানি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ও কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা করা গেলে কয়েক মাসের মধ্যেই জ্বালানির কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা সম্ভব।
শিল্পে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে। আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং আর্থিক চাপের কারণে তার পাঁচটি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
তার আশঙ্কা, উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব না হলে দীর্ঘ সময় শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা শুধু বর্তমান উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না; এটি নতুন বিনিয়োগ, রপ্তানি সক্ষমতা ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের ওপর জোর
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি করা জ্বালানির পাশাপাশি দ্রুত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও বন্ধ কূপ পুনরায় উৎপাদনে আনা প্রয়োজন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমামের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ, গ্যাস শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নয়; সারসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতুল্লাহও স্থলভাগ ও সমুদ্রের ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শক্তিশালী সিসমিক জরিপের মাধ্যমে নতুন গ্যাসক্ষেত্র শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলমের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণে আমদানিনির্ভরতার প্রবণতা বেড়েছে। বন্ধ বা কম উৎপাদনশীল কূপগুলো দ্রুত পুনরায় উৎপাদনে আনার পরিবর্তে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ফলে সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিকল্প হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক প্রকল্প থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। গভীর সমুদ্রের ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে তৃতীয় ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ২০২৮ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার পরিকল্পনাও করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পাশাপাশি বর্তমান সংকট সামাল দিতে বন্ধ গ্যাসকূপ দ্রুত পুনরায় উৎপাদনে আনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, জ্বালানির কৌশলগত মজুত বাড়ানো এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এতে শিল্পের উৎপাদন সচল রাখার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা 






















