নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাজশাহী বিভাগের ১০২ জন কৃষককে তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল পলিনেট হাউস। সরকারি অর্থে এসব হাউস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রতিটির পেছনে গড়ে খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। কিন্তু তিন বছর পর মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—বেশির ভাগ হাউসে ফসল নেই, কোথাও পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, কোথাও খুলে রাখা হয়েছে পুরো আবরণ। অনেক কৃষক লোকসান গুনে শেষ পর্যন্ত হাউসে আঙুরগাছ লাগিয়েছেন।
কৃষি বিভাগের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল অসময়ে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্ট্রবেরি, মেলন, শসাসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন। কিন্তু যাঁদের জন্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রযুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের বড় অংশই এখন বলছেন, পলিনেট হাউস তাঁদের লাভ তো দেয়ইনি, বরং বাড়তি খরচের বোঝা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়। রাজশাহীতে ২২টি, নাটোরে ২৯টি, নওগাঁয় ৭টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি, পাবনায় ১৭টি, জয়পুরহাটে ৬টি, বগুড়ায় ১১টি এবং সিরাজগঞ্জে ৪টি হাউস রয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে সাতটি হাউসের মধ্যে চারটির পলিথিন ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। একটির পলিথিন পুরোপুরি খুলে রেখেছেন কৃষক। ১৬ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে ১০ জন জানিয়েছেন, তাঁরা বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন। মাত্র ছয়জন লোকসান হয়নি বলে জানিয়েছেন; তাঁদের মধ্যে চারজন চারা উৎপাদন, একজন ফুল এবং একজন আঙুর চাষে সুবিধা পেয়েছেন।
পাবনার ঈশ্বরদীর কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, হাউসে নানা ধরনের ফসল চাষের চেষ্টা করেও কোনোটি সফল হয়নি। ভেতরে তাপমাত্রা এত বেশি যে কর্মীরাও কাজ করতে চান না। শেষ পর্যন্ত পলিথিন খুলে তিনি সেখানে পটোল চাষ করছেন। তাঁর ভাষ্য, ওই জমি ইজারা দিলে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা পাওয়া যেত।
নওগাঁর কৃষক মাসুদ রানা দাবি করেছেন, পলিনেট হাউসে চাষ করে তাঁর প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বিদেশি বীজ কিনতে এক লাখ এবং চাষে আরও তিন লাখ টাকা খরচ করেও আশানুরূপ ফলন পাননি। তাঁর অভিযোগ, হাউস নির্মাণে নিম্নমানের পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে।
রাজশাহীর পবার কৃষক মর্তুজা আহমেদের অভিজ্ঞতাও একই। ফসল ফলাতে না পেরে তিনি হাউসের এক পাশে আঙুরগাছ লাগিয়েছেন। তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত এই হাউসে চাষ করে এক টাকাও লাভ করতে পারেননি; বরং প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে প্রশিক্ষণের ঘাটতি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সেচযন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া। বেশির ভাগ হাউসের ‘মিক্সড ইরিগেশন সিস্টেম’ এখন অচল। কৃষকেরা বলছেন, যন্ত্রটি ঠিকমতো চালালে কখনো অতিরিক্ত আর্দ্রতা তৈরি হয়, আবার বন্ধ রাখলে ঘর অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়।
তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, কৃষকেরা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ না করায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, কৃষকেরা পরিশ্রম করতে চান না এবং তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন না। তাঁর দাবি, আঙুর ও জারবেরা চাষে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং চাষিদের এখন আঙুর চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে পলিনেট হাউস সফল করতে হলে ফসলভেদে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক বলেন, একেকটি ফসলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু পলিনেট হাউসগুলোতে প্রায় একই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ কারণেই প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১৮৭ কোটি টাকা। পলিনেট হাউসের পাশাপাশি কৃষকদের ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে ১০ হাজার ৭৩৩টি কৃষিযন্ত্র দেওয়া হয়েছে। কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পলিনেট হাউসগুলোর বড় অংশ যদি উৎপাদনের বদলে অব্যবহৃত পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের বাস্তব সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী 






















