১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অফিসে ১৩ ঘণ্টা, শরীরে বাজছে বিপদের ঘণ্টা! 

The gallery was not found!

অফিসে সকাল থেকে রাত। ডেস্কে বসে একের পর এক মিটিং, কাজের চাপ, সময়মতো টার্গেট পূরণের দুশ্চিন্তা—আধুনিক কর্মজীবনের এই ব্যস্ততা শুধু ক্লান্তিই বাড়াচ্ছে না, শরীরের ভেতরেও তৈরি করতে পারে বড় ধরনের চাপ। নতুন এক গবেষণায় তরুণ কর্মজীবী পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামনে এসেছে।

চীনের ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা ২২ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৮২৬ জন পূর্ণকালীন কর্মজীবী পুরুষকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। কর্মঘণ্টা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পদোন্নতির চাপ—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ পরিমাপ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৬৫ ঘণ্টা কাজ করতেন। বিপরীতে, তুলনামূলক কম চাপের দলের কর্মঘণ্টা ছিল প্রায় ৪২ ঘণ্টা।

শুধু কাজের সময়ের পার্থক্যই নয়, শরীরের হরমোনের মাত্রাতেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বেশি চাপের দলের সকালে কর্টিসল—যাকে সাধারণভাবে ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়—তুলনামূলক কম চাপের দলের চেয়ে প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি ছিল। একই সঙ্গে তাঁদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও প্রায় ৪০ শতাংশ কম পাওয়া যায়।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরকে দীর্ঘ সময় ধরে সতর্ক বা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অবস্থায় রাখতে পারে। এতে শরীর স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রমের বদলে চাপ মোকাবিলাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ফলে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যও প্রভাবিত হতে পারে।

গবেষণায় আরও একটি মজার তথ্য উঠে এসেছে। কর্টিসলের মাত্রা বাড়ার কয়েক সপ্তাহ পর টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা গেছে। এরপর আরও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে শারীরিক কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে—অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে।

তবে গবেষণাটি থেকে সরাসরি বলা যায় না যে দীর্ঘ সময় অফিসে থাকাই এসব সমস্যার একমাত্র কারণ। জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, মানসিক চাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে—সহযোগিতাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং সহায়ক বস কর্মীদের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু কর্মঘণ্টা কমানো নয়; কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের জন্য বার্তাটি তাই বেশ পরিষ্কার: কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শরীরের বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ঘড়ি যতই দীর্ঘ হোক, সুস্থ থাকার জন্য ঘুম, বিশ্রাম, ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জায়গা রাখতে হবে।

গবেষণাটি শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ প্রশ্নই সামনে আনে—কাজের জন্য আমরা কতটা সময় দিচ্ছি, আর নিজের শরীরের জন্য কতটা?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর
Business Times24

অফিসে ১৩ ঘণ্টা, শরীরে বাজছে বিপদের ঘণ্টা! 

Update Time : ১১:৪২:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অফিসে সকাল থেকে রাত। ডেস্কে বসে একের পর এক মিটিং, কাজের চাপ, সময়মতো টার্গেট পূরণের দুশ্চিন্তা—আধুনিক কর্মজীবনের এই ব্যস্ততা শুধু ক্লান্তিই বাড়াচ্ছে না, শরীরের ভেতরেও তৈরি করতে পারে বড় ধরনের চাপ। নতুন এক গবেষণায় তরুণ কর্মজীবী পুরুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামনে এসেছে।

চীনের ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা ২২ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৮২৬ জন পূর্ণকালীন কর্মজীবী পুরুষকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। কর্মঘণ্টা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পদোন্নতির চাপ—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ পরিমাপ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৬৫ ঘণ্টা কাজ করতেন। বিপরীতে, তুলনামূলক কম চাপের দলের কর্মঘণ্টা ছিল প্রায় ৪২ ঘণ্টা।

শুধু কাজের সময়ের পার্থক্যই নয়, শরীরের হরমোনের মাত্রাতেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বেশি চাপের দলের সকালে কর্টিসল—যাকে সাধারণভাবে ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়—তুলনামূলক কম চাপের দলের চেয়ে প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি ছিল। একই সঙ্গে তাঁদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও প্রায় ৪০ শতাংশ কম পাওয়া যায়।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরকে দীর্ঘ সময় ধরে সতর্ক বা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অবস্থায় রাখতে পারে। এতে শরীর স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রমের বদলে চাপ মোকাবিলাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ফলে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যও প্রভাবিত হতে পারে।

গবেষণায় আরও একটি মজার তথ্য উঠে এসেছে। কর্টিসলের মাত্রা বাড়ার কয়েক সপ্তাহ পর টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা গেছে। এরপর আরও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে শারীরিক কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে—অতিরিক্ত চাপ কমানোর জন্য সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সুযোগ রয়েছে।

তবে গবেষণাটি থেকে সরাসরি বলা যায় না যে দীর্ঘ সময় অফিসে থাকাই এসব সমস্যার একমাত্র কারণ। জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম, মানসিক চাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে—সহযোগিতাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং সহায়ক বস কর্মীদের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। অর্থাৎ, শুধু কর্মঘণ্টা কমানো নয়; কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের জন্য বার্তাটি তাই বেশ পরিষ্কার: কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শরীরের বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ঘড়ি যতই দীর্ঘ হোক, সুস্থ থাকার জন্য ঘুম, বিশ্রাম, ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জায়গা রাখতে হবে।

গবেষণাটি শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ প্রশ্নই সামনে আনে—কাজের জন্য আমরা কতটা সময় দিচ্ছি, আর নিজের শরীরের জন্য কতটা?