বিদেশ ভ্রমণে বাংলাদেশিদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাপ্তবয়স্ক একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বার্ষিক ভ্রমণ কোটায় বৈদেশিক মুদ্রা খরচের সীমা ১২ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় সীমা বেড়েছে ৬ হাজার ডলার বা ৫০ শতাংশ। ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন পরিপত্র অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশিকে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ধরন ও প্রয়োজন পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃত ভ্রমণ-সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণ করতেই এ সীমা বাড়ানো হয়েছে। এতে পর্যটন, পারিবারিক সফরসহ বৈধ বিদেশ ভ্রমণের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশিরা আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
তবে বার্ষিক কোটা বাড়লেও নগদ ডলারের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল রয়েছে। একজন ভ্রমণকারী একবারে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার নগদ নিতে পারবেন। অর্থাৎ ১৮ হাজার ডলারের পুরো সুবিধা নগদ নোট হিসেবে নেওয়া যাবে না; বাকি অংশ বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যয় করতে হবে। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের অনুমোদিত সীমার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৯ হাজার ডলারের সুবিধা থাকবে।
ভ্রমণ ব্যবসায় স্বস্তি
ভ্রমণ ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের জন্য সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণকারী, ট্রাভেল উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেবা ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে আগের ১২ হাজার ডলারের সীমা অনেক সময় বছরের শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেত। নতুন সীমা তাঁদের অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বার্ষিক কোটা বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিদেশে গিয়ে কার্ডের মাধ্যমে টিকিট, হোটেল, খাবার বা প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে লেনদেনের সীমাবদ্ধতাও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার।
একদিকে কোটা বাড়ল, অন্যদিকে কার্ডে বাধা
ভ্রমণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সাবিরা মেহেরিনের মতে, ১৮ হাজার ডলারের নতুন সীমা ইতিবাচক হলেও নিয়মিত আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী ও অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি খুব বেশি নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, বিদেশে বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং কিংবা কেনাকাটার সময় কার্ডের লেনদেন-সীমা অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে।
বিশেষ করে বড় অঙ্কের কোনো বৈধ কেনাকাটা করতে গেলে একাধিকবার লেনদেনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কখনো কখনো নিরাপত্তাজনিত কারণে কার্ড সাময়িকভাবে ব্লক হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বিদেশে অবস্থানরত একজন গ্রাহকের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ নয়।
অনলাইন ব্যবসাতেও প্রভাব
বিদেশি সফটওয়্যার, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন বিজ্ঞাপন কিংবা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন করা উদ্যোক্তাদের জন্যও আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিস্তারের ফলে ছোট উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজনও বেড়েছে। বাংলাদেশে কিছু ব্যাংক ইতিমধ্যে মাল্টি-কারেন্সি কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, চিকিৎসা ও সফটওয়্যার কেনার মতো বৈধ লেনদেনের সুবিধা চালু করেছে।
তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার ঠেকাতে নজরদারি বজায় রেখেই প্রকৃত ব্যবহারকারীদের জন্য কার্ডের লেনদেন-সীমা বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে ব্যাংকগুলোর পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ভ্রমণ কোটার সীমা ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজার ডলারে উন্নীত করা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন। তবে এর সুফল পুরোপুরি পেতে হলে নগদ ডলার ও কার্ড লেনদেন—দুই ক্ষেত্রের নিয়মকে বর্তমান আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ডিজিটাল ব্যবসার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















