ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় ধসে পড়া ছয় তলা মেসবাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১১ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষের আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) ও দিল্লি পুলিশ।
এনডিটিভি লিখেছে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডিইউ) সাউথ ক্যাম্পাসের কাছাকাছি হওয়ায় ওই মেসবাড়িতে (স্থানীয়রা বলেন পেইং গেস্ট হাউজ) ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের অনেক শিক্ষার্থী থাকতেন।
আনন্দবাজার জানিয়েছে, মৃতদের মধ্যে যুবরাজ নামের এক শিক্ষার্থী এবং এক নির্মাণ শ্রমিককে শনাক্ত করা গেছে। আহতদের দিল্লির এইমস এবং রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
‘হোস্টেল ডেজ’ নামের ওই ভবনে ৭৫ জন শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা ছিল। রোববার দুপুর দেড়টার দিকে ভবনটি হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে। তাতে ভবনের নিচে পার্ক করা বেশ কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই ভারতের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দিল্লি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবার কর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পাশাপাশি আটকে পড়াদের সন্ধানে তল্লাশি শুরু হয়। রোববার রাতভর সেই কাজ চলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো ভবনটি কয়েক মাস আগেও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। বছর খানেক আগে ভবনটি খালি করেও দেওয়া হয়েছিল।
ভবনটির মালিক হরিরাম বনসাল প্রায় ২০ বছর আগে গুরুগ্রামে চলে যান। সম্প্রতি বেশি ভাড়ার লোভে তিনি আবাসিক এই ভবনটিকে বাণিজ্যিক মেসবাড়ি হিসেবে সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
তখনই ভবনের নাম রাখা হয় ‘হোস্টেল ডেজ’ প্রায় ৩০ কক্ষের এই মেসবাড়ির প্রতিটি কক্ষে দুই থেকে তিনজনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
গত অগাস্ট মাসে সেখানে শিক্ষার্থী তোলা শুরু হয়, অথচ তখনো বেজমেন্টের সংস্কার ও দেয়াল ভাঙার কাজ চলছিল।
স্থানীয় এক বাসিন্দা এনডিটিভিকে বলেছেন, এলাকার অনেক বাড়ির মালিকই বেশি লাভের আশায় নিজেদের বাড়ি মেস হিসেবে ভাড়া দিয়ে অন্যত্র চলে যান এবং অনলাইনে শুধু ভাড়া সংগ্রহ করেন।
আনন্দবাজার লিখেছে, ভবনটি নির্মাণে যে নিয়ম মানা হয়নি, দিল্লি পুরসভা (এমসিডি) তা স্বীকার করেছে।
সংবাদসংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভবনটির মাত্র দোতলা পর্যন্ত অনুমোদন ছিল। পুরসভার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে বাকি চারটি তলা নির্মাণ করা হয়েছিল।
পুরসভার কার্যালয়ের সামনেই বছরের পর বছর ধরে এমন অবৈধ নির্মাণ কীভাবে টিকে ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে এলাকার নিচু রাস্তা এবং ওই ভবনের বেজমেন্টে পানি জমে গিয়েছিল। এর মধ্যেই সেখানে কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা।
আনন্দবাজার লিখেছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জমে থাকা পানি ও অবৈধ সংস্কার কাজের ফলে বেজমেন্টের পিলার দুর্বল হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় ভবন মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপ
সত্য নিকেতন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের পাশের একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মেসবাড়ি বা বেসরকারি হোস্টেলে থাকেন।
স্থানীয়দের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, ধসে পড়া ভবনটির অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছিলেন কেরালা, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা। তাদের অনেকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোতিলাল নেহেরু কলেজ, আত্মা রাম সনাতন ধর্ম কলেজ ও শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর কলেজে পড়তেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত হোস্টেল না থাকায় শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে চড়া ভাড়ায় এসব অনিরাপদ বেসরকারি মেসবাড়িতে থাকতে হয়। এ দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসনের দাবি নতুন করে সামনে এসেছে।
দুর্ঘটনার পরপরই অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার (এনএসইউআই) মত ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন। পুরসভার গাফিলতির অভিযোগ তুলে তারা বিক্ষোভও দেখান।
এনডিটিভি লিখেছে, আসন্ন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আবাসনের এই সংকট ক্যাম্পাসে বড় রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















