০৯:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি সংকটে কারখানায় ধাক্কা, তবু রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

The gallery was not found!

গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে যখন দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, তখন রপ্তানি খাতে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। সংকটের ধাক্কা সামলে আগস্টে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইল—প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর বেশির ভাগই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভালো করেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, আগস্টে বাংলাদেশ ৪৪৩ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। গত বছরের আগস্টে যার পরিমাণ ছিল ৩৯১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।

তবে মাসভিত্তিক হিসাবে চিত্রটি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। জুলাইয়ে ৪৭৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও আগস্টে তা নেমে এসেছে ৪৪৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তারপরও জুলাইয়ের দুর্বলতার পর আগস্টের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৯১৬ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

সংকটের মধ্যেও পোশাক খাতে বড় প্রবৃদ্ধি

রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত আগস্টে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। মাসটিতে ৩৬১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলারের। এ সময়ে খাতটির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ।

অবশ্য এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে খাতটির উদ্যোক্তাদের মধ্যেই কিছুটা বিস্ময় রয়েছে। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পুরো আগস্টজুড়েই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে স্পিনিং ও ডায়িং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে নিট পোশাকে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

চার খাতে উত্থান

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাতের মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ছাড়া বাকি চার খাতেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। আগস্টে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১৩ কোটি ডলার। জুলাই-আগস্ট মিলিয়ে খাতটির রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ডলারে, প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও আগস্টে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক মাসে এই খাত থেকে ৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।

হোম টেক্সটাইলেও রয়েছে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। আগস্টে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ বেশি। প্রথম দুই মাসে এই খাতের রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশ; আয় হয়েছে ১৫ কোটি ডলার।

কৃষিপণ্যে উল্টো স্রোত

রপ্তানির সামগ্রিক চিত্র ইতিবাচক হলেও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। টানা দুই মাস ধরে এই খাতের রপ্তানি কমছে।

আগস্টে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। জুলাই-আগস্টে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইবের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জাহাজভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।

সামনে বড় প্রশ্ন

রপ্তানি খাতে আগস্টের প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। বিশেষ করে শিল্পের উৎপাদন যখন জ্বালানি সংকটে বাধাগ্রস্ত, তখন তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট ও হোম টেক্সটাইলের ভালো প্রবৃদ্ধি রপ্তানি সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে।

তবে মাসভিত্তিক রপ্তানি কমে যাওয়া এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ধারাবাহিক পতন নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে এনেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে কতটা চাপে ফেলবে?

অর্থাৎ আগস্টের পরিসংখ্যান আপাতত স্বস্তি দিলেও সামনে রপ্তানি খাতের আসল পরীক্ষা হবে জ্বালানি সংকট সামলে উৎপাদনের গতি কতটা ধরে রাখা যায়, তার ওপর।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর
Business Times24

জ্বালানি সংকটে কারখানায় ধাক্কা, তবু রপ্তানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

Update Time : ০৯:১৬:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে যখন দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত, তখন রপ্তানি খাতে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। সংকটের ধাক্কা সামলে আগস্টে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হোম টেক্সটাইল—প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর বেশির ভাগই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভালো করেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, আগস্টে বাংলাদেশ ৪৪৩ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। গত বছরের আগস্টে যার পরিমাণ ছিল ৩৯১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।

তবে মাসভিত্তিক হিসাবে চিত্রটি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। জুলাইয়ে ৪৭৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও আগস্টে তা নেমে এসেছে ৪৪৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তারপরও জুলাইয়ের দুর্বলতার পর আগস্টের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৯১৬ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

সংকটের মধ্যেও পোশাক খাতে বড় প্রবৃদ্ধি

রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত আগস্টে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। মাসটিতে ৩৬১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭৫০ কোটি ডলারের। এ সময়ে খাতটির প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ।

অবশ্য এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে খাতটির উদ্যোক্তাদের মধ্যেই কিছুটা বিস্ময় রয়েছে। নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পুরো আগস্টজুড়েই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে স্পিনিং ও ডায়িং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে নিট পোশাকে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

চার খাতে উত্থান

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাতের মধ্যে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ছাড়া বাকি চার খাতেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। আগস্টে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১৩ কোটি ডলার। জুলাই-আগস্ট মিলিয়ে খাতটির রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ডলারে, প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও আগস্টে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক মাসে এই খাত থেকে ৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি।

হোম টেক্সটাইলেও রয়েছে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। আগস্টে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ বেশি। প্রথম দুই মাসে এই খাতের রপ্তানি বেড়েছে ১১ শতাংশ; আয় হয়েছে ১৫ কোটি ডলার।

কৃষিপণ্যে উল্টো স্রোত

রপ্তানির সামগ্রিক চিত্র ইতিবাচক হলেও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। টানা দুই মাস ধরে এই খাতের রপ্তানি কমছে।

আগস্টে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। জুলাই-আগস্টে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইবের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জাহাজভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া এবং পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।

সামনে বড় প্রশ্ন

রপ্তানি খাতে আগস্টের প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। বিশেষ করে শিল্পের উৎপাদন যখন জ্বালানি সংকটে বাধাগ্রস্ত, তখন তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট ও হোম টেক্সটাইলের ভালো প্রবৃদ্ধি রপ্তানি সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে।

তবে মাসভিত্তিক রপ্তানি কমে যাওয়া এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ধারাবাহিক পতন নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে এনেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘ হলে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে কতটা চাপে ফেলবে?

অর্থাৎ আগস্টের পরিসংখ্যান আপাতত স্বস্তি দিলেও সামনে রপ্তানি খাতের আসল পরীক্ষা হবে জ্বালানি সংকট সামলে উৎপাদনের গতি কতটা ধরে রাখা যায়, তার ওপর।