দেশের ব্যাংক খাতে যখন খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, ঠিক তখনই বড় ঋণখেলাপিদের জন্য বড় ধরনের ছাড় ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ঋণগ্রহীতারা পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের পর ঋণ পরিশোধে পাবেন ১৫ বছর সময়। শুধু তা-ই নয়, প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই সিদ্ধান্তে একদিকে সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বড় ঋণখেলাপিদের প্রতি অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নও সামনে এসেছে। কারণ, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নতুন সুবিধা নিতে ঋণখেলাপিদের চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই আবেদন করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে এসব আবেদন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংকটে শিল্প, বাড়ছে ঋণের চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যবসায়িক মন্দা এবং ঋণের সুদব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের আয় কমেছে। ফলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বাড়তি সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বড়দের জন্য ১৫ বছর
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ঋণগ্রহীতার ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকার বেশি হলে দুই বছরের কিস্তি বিরতিসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে।
অর্থাৎ ঋণ পুনঃতফসিলের পর প্রথম দুই বছর ঋণগ্রহীতাকে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। এরপর বাকি সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
আগে বিশেষ সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করা ঋণের ক্ষেত্রে সেই সময়কাল নতুন মেয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
আগের সুবিধা ফিরল নতুন রূপে
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। সে সময় বিদ্যমান খেলাপি ঋণের অন্তত ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ ছিল। ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর পর্যন্ত পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তিন বা তার বেশি বার ঋণ পুনঃতফসিল করা থাকলে অতিরিক্ত ১ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার বিধানও ছিল।
সেই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এবার নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হলো।
কারা পাচ্ছেন সুবিধা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সিটি গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাতসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন ও যোগাযোগ করেছে। তাদের আবেদন ও পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বড় ঋণখেলাপিদের জন্য বাড়তি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া।
খেলাপি ঋণের পাহাড়
ছাড় দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এসেছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্রের মধ্যেই।
গত মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
গত ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ঋণ খেলাপি।
পরিসংখ্যান বলছে, তিন মাসে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ যতটা বেড়েছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে তার প্রায় চার গুণ।
অনিয়মের দীর্ঘ ছায়া
ব্যাংকারদের মতে, গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, প্রিমিয়ার, বিসমিল্লাহ ও হল-মার্কসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম এবং কয়েকটি ব্যাংকের কেলেঙ্কারি ব্যাংক খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারও ৮০ শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দুই ধরনের মত
এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান মনে করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে এবং বর্তমান চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে তার মতে, এ সুবিধা গণহারে দেওয়া উচিত নয়। পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরীক্ষিত ভালো ব্যবসায়ীদেরই এ সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ব্যাংক খাতের গভীর সংকট থেকে উত্তরণে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে অর্থ পাচারকারী ও অর্থ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তার মতে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সুশাসন বজায় রেখেই এই নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা
শুধু খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল নয়, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতেও বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
১ সেপ্টেম্বর থেকে এ তহবিলের ঋণ বিতরণ শুরু করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—চার মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছরের সময় এবং প্রথম দুই বছরের কিস্তি ছাড় নিঃসন্দেহে বড় সুবিধা। এতে প্রকৃত সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ছাড় কি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাবে, নাকি বড় ঋণখেলাপিদের জন্য দায় এড়ানোর আরও একটি সুযোগ তৈরি করবে?
উত্তরটি নির্ভর করবে এই সুবিধা কারা পাচ্ছেন, কী শর্তে পাচ্ছেন এবং ব্যাংকগুলো কতটা কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করছে—তার ওপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















