বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টিইইউ বাড়তি কনটেইনার সামলানোর লক্ষ্য। বড় জাহাজ ভেড়ানো ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা মিলবে। তবে সুফল পেতে শুল্কায়ন, সড়ক–রেল সংযোগ ও পরিচালন দক্ষতাও বদলাতে হবে।
বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানির বড় দুর্বলতা শুধু সমুদ্রপথের দূরত্ব নয়; বন্দরে অপেক্ষা, পণ্য খালাসে অনিশ্চয়তা এবং কারখানা থেকে জেটি পর্যন্ত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রাও বড় সমস্যা। সেই পুরোনো সংকটের মাঝেই চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় শুরু হলো লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ।
রোববার (৩০ আগস্ট) লালদিয়ার চরে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করে ২০৩০ সালে টার্মিনালটি চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
এটি সময়মতো কার্যকর হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতায় বড় সংযোজন ঘটবে। তবে একটি টার্মিনাল নির্মাণ আর দেশের বাণিজ্যব্যবস্থা বদলে দেওয়া এক কথা নয়। মাঝখানে আছে বাস্তবায়ন, দক্ষতা এবং জবাবদিহির দীর্ঘ তালিকা।
প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিদেশি বিনিয়োগের টার্মিনাল
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডেনমার্কের এপি মোলার–মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড। টার্মিনালের জমি ও মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে; বেসরকারি অংশীদার নির্মাণ, অর্থায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব নেবে।
প্রকল্পের নির্মাণ শেষে এপিএম টার্মিনালস ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে। নির্ধারিত কর্মদক্ষতা ও চুক্তির শর্ত পূরণ হলে মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্প-সারসংক্ষেপে এটিকে দেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর প্রথম বড় গ্রিনফিল্ড পিপিপি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে টার্মিনালটি। এতে থাকবে প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটি, সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি বৈদ্যুতিক রাবার-টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি বৈদ্যুতিক টার্মিনাল ট্রাক্টর।
জেটিতে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের ছয় হাজার টিইইউ পর্যন্ত ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি ভেড়া জাহাজগুলোর সাধারণ ধারণক্ষমতা এর প্রায় অর্ধেক। এপিএম টার্মিনালসের প্রকল্পতথ্যেও এই কারিগরি বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ রয়েছে।
সক্ষমতা বাড়বে প্রায় এক-চতুর্থাংশ
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৪ লাখের বেশি টিইইউ কনটেইনার সামলেছে। দেশের কনটেইনারবাহী আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশই এই বন্দরের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিলম্বের প্রভাবও কারখানা, বাজার এবং ভোক্তার খরচ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
লালদিয়ার প্রাথমিক বার্ষিক সক্ষমতা আট লাখের বেশি টিইইউ। পুরোপুরি সচল হলে তা নয় লাখ থেকে প্রায় ১০ লাখ টিইইউতে পৌঁছাতে পারে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বর্তমান কনটেইনার পরিবহনের হিসাবে এটি প্রায় ২৩ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি সক্ষমতার সমান।
তবে বিভিন্ন সরকারি ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে কখনো ৩০ শতাংশ, কখনো ৪৪ শতাংশ সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। পার্থক্যটি মূলত কোন সময়ের সক্ষমতা বা প্রকৃত পরিবহনকে ভিত্তি ধরা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে। একই অঙ্ককে নানা শতাংশে সাজালে প্রকল্প বড় দেখায় বটে, কিন্তু কনটেইনার একটি চমৎকার নির্দয় বস্তু—তার হিসাব বক্তৃতায় বদলায় না।
কোথায় মিলতে পারে অর্থনৈতিক সুবিধা
লালদিয়ার অবস্থান বর্তমান বন্দর এলাকার তুলনায় সমুদ্রের কাছাকাছি। ফলে জাহাজকে কর্ণফুলীর ভেতরের একাধিক বাঁক অতিক্রম করতে হবে না। বড় জাহাজে একসঙ্গে বেশি কনটেইনার পরিবহন করা গেলে প্রতিটি কনটেইনারের পরিবহন ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে। বাড়তে পারে নতুন জাহাজসেবা এবং নির্দিষ্ট কিছু গন্তব্যে সরাসরি সংযোগ।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, চামড়া, ওষুধ ও হালকা প্রকৌশল খাত। এসব ব্যবসায় শুধু পরিবহন খরচ নয়, পণ্য ঠিক সময়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরে অপেক্ষা ও খালাসের সময় কমলে রপ্তানিকারকের কার্যাদেশ ধরে রাখা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা সহজ হবে।
প্রকল্পটি নির্মাণ ও পরিচালনায় ৫০০ থেকে ৭০০ প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং পরিবহন, গুদাম, কনটেইনার ডিপো, রক্ষণাবেক্ষণ ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে আরও পরোক্ষ কাজ তৈরির হিসাব দিয়েছে বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে প্রচলিত ডিজেলনির্ভর টার্মিনালের তুলনায় দূষণও কম হওয়ার কথা।
বিনিয়োগের অঙ্কে দুই হিসাব
প্রকল্পটির বিনিয়োগমূল্য নিয়ে অবশ্য পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ২০২৫ সালে চুক্তির সময় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫৫ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছিল। এপিএম টার্মিনালসের হালনাগাদ প্রকল্পপাতায় এখন ৭৬ কোটি ডলার উল্লেখ রয়েছে। দুটি অঙ্কের পার্থক্য ২১ কোটি ডলার।
নির্মাণব্যয় সংশোধন, অতিরিক্ত সরঞ্জাম কিংবা পরিচালন পর্যায়ের বিনিয়োগ যুক্ত হওয়ার কারণে পার্থক্যটি তৈরি হয়েছে কি না, তার ব্যাখ্যা প্রকাশিত প্রকল্পতথ্যে স্পষ্ট নয়। ফলে ৭৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকাকে চূড়ান্ত নির্মাণব্যয় হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন অর্থের পাশাপাশি প্রতি কনটেইনারের ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রায় ফি পাবে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ চুক্তির অনুলিপি জনসমক্ষে না থাকায় শুল্ক নির্ধারণ, কর্মদক্ষতার মানদণ্ড, চুক্তি নবায়ন, ব্যর্থতার জরিমানা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির সব শর্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না। কয়েক দশকের একটি জাতীয় অবকাঠামো চুক্তির ক্ষেত্রে এই তথ্য প্রকাশ ঐচ্ছিক সৌজন্য নয়; এটি জবাবদিহির ন্যূনতম শর্ত।
তাই লালদিয়া অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়েছে কি না, সেটি ভিত্তিপ্রস্তরের অনুষ্ঠানে নির্ধারণ হবে না। ২০৩০ সালের পর দেখতে হবে—জাহাজের অবস্থানকাল কতটা কমল, পণ্য খালাস দ্রুত হলো কি না, রপ্তানির পরিবহন ব্যয় ও সময় কমল কি না এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ কত রাজস্ব পেল।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















