দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য অবশেষে কার্যকর হচ্ছে টাকা উত্তোলনের সুযোগ।
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে গ্রাহকেরা তাঁদের হিসাবে জমা থাকা সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন উত্তোলন বা নগদায়ন করতে পারবেন। তবে এই অর্থের সঙ্গে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না।
টাকা উত্তোলনের জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে ব্যাংকের শাখাগুলোতে আবেদন নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ১ সেপ্টেম্বর থেকে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যক্তি গ্রাহকদের স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে আমানত ফেরতের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে শাখা ও উপশাখাগুলোতে নগদ অর্থের চাহিদা নির্ধারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় নগদ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ক্যাশ ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
এই প্রস্তুতির জন্য কয়েক দিন সময় প্রয়োজন হওয়ায় ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা বিশেষ প্রজ্ঞাপনে বিভাগীয় প্রধান, জোনাল প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অপারেশনসের প্রধান সমন্বয়ক এ এফ সাব্বির আহমদ।
চলতি, সঞ্চয়ী ও মেয়াদি হিসাব—সবখান থেকেই মূল টাকা তোলার সুযোগ
ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকেরা আল-ওয়াদিয়া চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব এবং বিভিন্ন মেয়াদি হিসাব থেকে জমা করা মূল অর্থ তুলে নিতে পারবেন। এর মধ্যে এমটিডিআর ও ডিপিএসও রয়েছে।
তবে যারা হিসাব বন্ধ না করে চালু রাখবেন, তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী পূর্বনির্ধারিত হারে মুনাফা পেতে থাকবেন। ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে মুনাফাসহ যেকোনো পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।
গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে ১ সেপ্টেম্বর বিশেষ দিবস
আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি গ্রাহকদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ১ সেপ্টেম্বরকে বিশেষ দিবস হিসেবে পালনের নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
এ দিন ব্যাংকের শাখা ও উপশাখাগুলো সুন্দরভাবে সাজানো হবে। কর্মকর্তাদের নির্ধারিত ও মার্জিত পোশাকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। গ্রাহকদের ফুল বা উপহার দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নাগরিক, নারী ও প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শাখাগুলোতে পরিচ্ছন্ন ও ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি সেবার মান ও গ্রাহক সন্তুষ্টির ওপর সর্বোচ্চ নজর দিতে বলা হয়েছে। গ্রাহকসেবা কার্যক্রমের ভিডিও চিত্র ধারণের নির্দেশনাও রয়েছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত নতুন ব্যাংক
বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারা এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
এই পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
তবে ব্যাংকটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। পাঁচ ব্যাংকের মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ খেলাপি। পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।
৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন
সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত না পাওয়ায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, ৭ সেপ্টেম্বর থেকে মূল অর্থ ফেরতের উদ্যোগ সেই পরিস্থিতিতে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। তবে বিপুল খেলাপি ঋণ ও বড় মূলধন ঘাটতি সামলে ব্যাংকটির কার্যক্রম কতটা দ্রুত ও পুরোপুরি স্বাভাবিক করা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















