ঘুষ যেন সরকারি সেবার আড়ালে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য করের নাম। কোথাও সেবা পেতে, কোথাও বদলি বা নিয়োগে, আবার কোথাও মামলা থেকে রেহাইয়ের আশ্বাসে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠছে।
আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুষ ও দুর্নীতির একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কোথাও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে, কোথাও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, আবার কোথাও আদালতে মামলা ও রিমান্ডের মতো আইনি পদক্ষেপ হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় আলোড়ন তৈরি করেছে নতুন চালু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’।
২১ আগস্ট চালুর মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সেখানে ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযোগগুলোতে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
উদ্যোক্তাদের প্রকাশিত তথ্যে, প্রথম দুই দিনেই ৮০৪টি অভিযোগে প্রায় ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির কথা জানানো হয়। তিন দিনে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২৯-এ; অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। তবে এসব তথ্য অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য—প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা বা প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তবু সংখ্যাগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—সরকারি সেবা পেতে নাগরিকদের কতটা ঘুষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে?
ঘুষের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে ‘ঘুষ.সাইট’
ঘুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’ অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক আলোচনায় আসে। নাম-পরিচয় গোপন রেখে সেখানে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ জানানো যাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেবা নিয়ে অভিযোগ জমা পড়ার ফলে সরকারি সেবায় দুর্নীতির সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি চিত্র সামনে এসেছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা বেশি হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অভিযোগ যাচাই ও তদন্তই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের নাম ব্যবহার করেও ঘুষ!
ঘুষের অভিযোগের পাশাপাশি প্রতারণার একটি ভয়ংকর দিকও সামনে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ আদায়ের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একটি চক্র দুদকের চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং মামলা করা হয়েছে।
অর্থাৎ ঘুষের বিরুদ্ধে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেও চলছে অর্থ আদায়ের চেষ্টা—যা দুর্নীতির নতুন কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিআরটিএ ঘিরে বড় অঙ্কের ঘুষের অভিযোগ
সরকারি সেবায় ঘুষের অভিযোগের আরেকটি আলোচিত ক্ষেত্র বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ। গাড়ি প্রতিস্থাপন ও নিবন্ধনের মতো কাজে দালালচক্রের মাধ্যমে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের খবর সামনে এসেছে।
অভিযোগের অঙ্কও বড়—প্রায় ১১৩ কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের কথা আলোচনায় এসেছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অনিয়ম নয়; বরং সরকারি সেবাকে ঘিরে একটি সংগঠিত মধ্যস্বত্বভোগী চক্র কীভাবে সক্রিয় থাকতে পারে, তারও ইঙ্গিত দেয়।
নিয়োগের নামেও প্রতারণা
ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে প্রতারণাও। সরকারি কর্মকর্তার সিল-স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
আবার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম, পরিচয়, সিল-স্বাক্ষর ও সরকারি লেটারহেড ব্যবহার করে জাল নথি তৈরির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, সরকারি চাকরি ও সেবাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ঘুষের অভিযোগে দুদকের অভিযান, হাতেনাতে গ্রেপ্তার, মামলা ও তদন্ত—সবই হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিভিন্ন ঘটনায় সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই কি ঘুষের মূল উৎস বন্ধ হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুষ কমাতে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। সরকারি সেবা যতটা সম্ভব অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় করা, দালালনির্ভরতা কমানো, সেবার সময়সীমা স্পষ্ট করা, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষের অভিযোগ এখনো বড় সমস্যা। দালালচক্র অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ঘুষের বিস্তার ঠেকানো কঠিন।
ঘুষের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে; কিন্তু অভিযোগের ধারাবাহিকতা বলছে, সমস্যাটি কেবল কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সেবাব্যবস্থা, দালালনির্ভরতা, জবাবদিহির ঘাটতি এবং নাগরিকের অসহায়ত্ব।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘুষখোরকে ধরার পাশাপাশি ঘুষ দেওয়ার পরিস্থিতিটাই কি বন্ধ করা যাবে? কারণ নাগরিকের সেবা যদি তার অধিকার হয়, তাহলে সেই সেবার জন্য ঘুষ দাবি করার সুযোগ কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















