দেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন সার প্রয়োজন হয়। এর প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যবহার করা হয় ধান চাষে। আবার মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি সার আমদানি করতে হয়।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বা দামে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব দেশের কৃষি ও খাদ্যবাজারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমন-বোরোতেই বড় ঝুঁকি
আমন মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর এবং বোরো মৌসুম অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি আসে এই দুই মৌসুম থেকে। এ সময়ে প্রয়োজন হয় ৪৩ লাখ টনের বেশি রাসায়নিক সার।
সময়মতো সার না পেলে কৃষকেরা সার প্রয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে ধানের ফলন কমার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে আমন ধান এখন দ্রুত বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাকায় সারের ঘাটতি হলে এর প্রভাব পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামানের মতে, আমনের ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। কারণ পরবর্তী বড় ধানের মৌসুম বোরোর ফসল কৃষকের ঘরে আসবে এপ্রিলের আগে নয়। ফলে আমনে উৎপাদন কমলে মাঝের সময়ে চালের বাজারে চাপ বাড়তে পারে।
আমদানিনির্ভরতার বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের সার সরবরাহে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ তার মোট ডিএপি সারের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সৌদি আরব থেকে আমদানি করেছে।
অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের সাতটি সার কারখানার মধ্যে তিনটি বর্তমানে বন্ধ। এতে আমদানিনির্ভরতা আরও বেড়েছে।
সারের ঘাটতি মোকাবিলায় গত দুই সপ্তাহে সরকার বিভিন্ন ধরনের ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে বিশ্বব্যাংক জরুরি সার আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে ৩০ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে সময়মতো সার সরবরাহের সুযোগ তৈরির কথা রয়েছে।
তবে এই অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি সার চাহিদা বা নিয়মিত ভর্তুকির জন্য নয়; মূলত চলতি আমন ও আসন্ন বোরো মৌসুমের জরুরি চাহিদা মেটাতেই এটি দেওয়া হয়েছে।
কাগজে পর্যাপ্ত, মাঠে সংকট
সরকারের হিসাবে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ২৯ আগস্ট ফরিদপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। তার অভিযোগ, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মন্ত্রী জানান, দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ লাখ টন বেশি সার আমদানি করা হয় এবং সরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামজুতও রাখে। বেশি দাম না দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সব ধরনের সারের মিলিত নিরাপত্তামজুত প্রায় ১৭ লাখ টন। এতে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতে প্রায় ১৮ লাখ টন মজুত থাকলেও ২৪ আগস্ট তা কমে ১৪ লাখ টনে নেমেছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকায় কৃষকেরা সার ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি এলাকায় সার সরবরাহের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা।
সমস্যা কি সরবরাহ ব্যবস্থায়?
কৃষি অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামানের প্রশ্ন, সরকারি হিসাবে যদি পর্যাপ্ত সার মজুত থাকে, তাহলে কৃষকের হাতে তা পৌঁছাচ্ছে না কেন?
তার মতে, গুদামে সার পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই। সেটি সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছানোই মূল বিষয়। কৃষকদের কেন সার পেতে ডিলারের গুদামে যেতে হচ্ছে বা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে, তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি বলেন, সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগ ব্যবস্থায় স্থানীয় কোনো প্রভাব, অনিয়ম বা সমস্যা রয়েছে কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
সরকারের গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি মত দিয়েছেন, এই কমিটিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা, সার ডিলার এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা উচিত।
কৃষকের সংকট মানেই খাদ্যবাজারের সংকট
দেশের মোট কৃষক পরিবারের ৯২ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। তারা মোট আবাদি জমির প্রায় ৬৫ শতাংশ চাষ করেন। ফলে সারের দাম বেড়ে যাওয়া কিংবা সময়মতো সার না পাওয়ার ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা তাদের তুলনামূলক কম।
২০২৪ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত ছিল। সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নারীদের কর্মসংস্থানেরও অন্যতম বড় ক্ষেত্র কৃষি।
দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয়। মানুষের মোট ক্যালরি চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে চাল থেকে। ফলে ধানের উৎপাদন ও চালের দাম—দুটিই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সবচেয়ে কম আয়ের ৪০ শতাংশ পরিবারের খাদ্য ব্যয়ের ২২ শতাংশই চাল কিনতে ব্যয় হয়। তাই চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে এবং নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।
সামনে তাই একটাই চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও কৃষি খাত এখনো নানা ঝুঁকিতে রয়েছে। উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এবং কৃষি উপকরণ আমদানিতে বাইরের দেশের ওপর নির্ভরতা এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো কৃষকের হাতে সঠিক সময়ে ন্যায্য দামে সার পৌঁছে দেওয়া। কারণ সার সংকট যদি মাঠে উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তার পরের ধাক্কা আসবে চালের বাজারে। আর সেই ধাক্কার সবচেয়ে বড় বোঝা বইতে হবে দেশের নিম্নআয়ের মানুষকেই।
অর্থাৎ, সার সংকটের সমাধান শুধু কৃষকের স্বার্থ রক্ষা নয়—এটি খাদ্যনিরাপত্তা, চালের বাজার এবং দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















