দেশের বাজারে পুরোনো, ছেঁড়া ও জীর্ণ ব্যাংক নোটের উপস্থিতি নিয়ে মানুষের ভোগান্তি আবারও আলোচনায় এসেছে। দোকানপাট থেকে শুরু করে ব্যাংকের ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), এটিএম ও বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে পুরোনো নোট গ্রহণ না করায় নগদ লেনদেনে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝামেলা।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একজন গ্রাহক ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে গিয়ে ৫০০ টাকার ১০০টি নোটের মধ্যে ৩৬টি নোট সিআরএমে জমা দিতে পারেননি। নোটগুলো অতিরিক্ত পুরোনো হয়ে যাওয়ায় যন্ত্র সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে। অথচ ওই নোটগুলো তিনি অন্য একটি ব্যাংক থেকেই তুলেছিলেন।
নতুন নোটের সরবরাহে ধীরগতি
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারে ভালো মানের নোটের ঘাটতির পেছনে রয়েছে নতুন নোট ছাপানোর ধীরগতি এবং পুরোনো নোট প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় চাপ। নতুন নকশার নোট চালুর প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় নগদ অর্থের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের সামঞ্জস্য তৈরি করা কঠিন হয়েছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নোট সরবরাহের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। আগে ঈদের আগে বিশেষভাবে নতুন নোট বাজারে দেওয়া হলেও এখন সারা বছর ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নোট সরবরাহের নীতি নেওয়া হয়েছে।
নতুন নকশার ১০ টাকার নোট ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটের নতুন সংস্করণও পর্যায়ক্রমে বাজারে আসছে। তবে সব মূল্যমানের নোটের সরবরাহ এখনো সমান নয়।
ছেঁড়া নোট বদলের নির্দেশ
সমস্যা কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ছেঁড়া, বিকৃত ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং বিনিময়ের নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার মতো ছোট মূল্যমানের নোটের ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক শাখাগুলোতে এ ধরনের নোট বদলের জন্য বিশেষ কাউন্টার রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে জানিয়েছিল, নিয়ম মেনে ছেঁড়া ও নষ্ট নোট গ্রহণ না করলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে বাস্তবে অনেক মানুষ এখনো জানেন না, কোথায় গেলে নষ্ট নোট বদলে সমমূল্যের নোট পাওয়া যায়। ফলে তারা অনেক সময় দোকানদার বা পাইকারের কাছে নোটটি চালানোর চেষ্টা করেন। সেখানে প্রত্যাখ্যাত হলে নোটটি কার্যত তাদের হাতেই আটকে থাকে।
নোট ছাপাতেও বেড়েছে ব্যয়
নতুন নোট সরবরাহের পাশাপাশি বেড়েছে নোট তৈরির ব্যয়ও। নিরাপত্তা কাগজ, বিশেষ কালি, নিরাপত্তা সুতা ও অন্যান্য উপকরণের বড় অংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন নোট ছাপানোর খরচ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে একটি ২০ টাকার নোট ছাপাতে যেখানে ১ টাকা ৫৮ পয়সা খরচ হতো, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়ায়। একই সময়ে ৫০ টাকার নোটের ছাপার খরচ ১ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বেড়ে ৪ টাকা ৮৯ পয়সা হয়েছে।
অর্থাৎ কম মূল্যমানের নোট উৎপাদনের ক্ষেত্রে ছাপার ব্যয় নোটের অভিহিত মূল্যের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠছে।
নগদ থেকে ডিজিটালে যাওয়ার চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ লেনদেনের ওপর চাপ কমাতে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলা QR-এর ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে ছোট অঙ্কের নগদ লেনদেন কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নগদ টাকা এখনো দেশের দৈনন্দিন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও নিম্ন আয়ের মানুষের বড় অংশ এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও ভালো মানের নোটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু নতুন নোট ছাপানো যথেষ্ট নয়। বাজার থেকে অযোগ্য নোট দ্রুত প্রত্যাহার, ব্যাংক শাখায় সহজে নোট বদলের ব্যবস্থা এবং নগদ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর—যারা প্রতিদিনের বাজার, যাতায়াত ও ছোটখাটো লেনদেনে এখনো হাতে থাকা নোটের ওপর নির্ভরশীল।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















