মূল্যস্ফীতির হার যখন ধীরে ধীরে কমার দিকে, ঠিক সেই সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, শিল্প, উৎপাদন, বিপণন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়বে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমার গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি জ্বালানির দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ গণপরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারি কর্মীদের আয় বাড়লেও বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর আয় একই হারে বাড়বে না। ফলে একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে অনেক মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ধীরে ধীরে সমন্বয়ের পরামর্শ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি ও পরিবহন খাতের পর এর প্রভাব শিল্প ও উৎপাদন খাতেও পড়ে।
তার মতে, প্রতি লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি বড় ধরনের সমন্বয়। এর ফলে বাস পরিচালনার ব্যয় কতটা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত যাত্রীভাড়ায় তার কতটা প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নাজনীন আহমেদ মনে করেন, ভর্তুকির চাপ কমানোর প্রয়োজন থাকলেও তা ধাপে ধাপে করা যেত। বিশেষ করে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রেখে পেট্রোল ও অকটেনের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারত।
তিনি বলেন, দরিদ্র পরিবার, গণপরিবহন ও শিল্পে ডিজেল ও কেরোসিনের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এসব জ্বালানির দাম বাড়লে তুলনামূলকভাবে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বেশি পড়বে।
নতুন বেতন স্কেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আলাদাভাবে বেতন বাড়ানোর প্রভাব সীমিত হতে পারে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বেতন সমন্বয় একই সময়ে হওয়ায় মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে।
উৎপাদন ও বিপণন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দীন ইসলাম বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদন, বিপণন ও ঋণের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এসব ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বাড়ার চাপ তৈরি হবে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব কতদিন থাকবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকার কীভাবে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে তার ওপর। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে আয় সমন্বয় না হলে কর্মীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
দীন ইসলাম বলেন, জ্বালানির দাম কম রাখতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের রাজস্বের ওপর চাপ বাড়ে। আবার দাম বাড়ালে তার প্রভাব স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে সরকারকে রাজস্ব ও ভর্তুকির মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।
কর ও চার্জ কমানোর প্রস্তাব
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, দাম বাড়ানোর আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং সরকারের পক্ষ থেকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি মনে করেন, জ্বালানির দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়ে তেলের ওপর আরোপিত বিভিন্ন কর, ফি ও চার্জ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। রাজস্ব ঘাটতিও জ্বালানির দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, জ্বালানির দাম অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন ব্যয়ের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
বিশেষ করে বেসরকারি খাতের কর্মী ও দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়বে। কৃষিকাজে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কৃষিপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তার আশঙ্কা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতার মতো কয়েকটি চাপ একই সময়ে অর্থনীতিতে কাজ করতে পারে। শিল্পায়নের গতি ও শ্রমবাজারে স্থবিরতা কাটানোও তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন থেকে কৃষি, উৎপাদন থেকে বিপণন—বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার বর্তমান প্রবণতা কতটা ধরে রাখা যাবে, সেটিই এখন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















