মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, আর তার উত্তাপ এসে পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম লাফিয়ে বাড়ায় গ্যাস আমদানিতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি হাজার হাজার কোটি টাকা।
একদিকে চড়া দামে এলএনজি কেনা, অন্যদিকে কম দামে গ্যাস সরবরাহ—এই দুইয়ের ফাঁকে সরকারের ভর্তুকির খাতেই তৈরি হচ্ছে বড় গর্ত। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে গ্যাসে সরকারের ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ দূরের যুদ্ধের আগুন এবার জ্বলতে শুরু করেছে দেশের জ্বালানি বিলেও।
স্পট মার্কেটেই বড় ধাক্কা
যুদ্ধের আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০–১২ ডলারে কেনা হলেও বর্তমানে তা ২৪ ডলারের বেশি। ফলে একটি এলএনজি কার্গোর দামও হাজার কোটি টাকার ওপরে উঠে যাচ্ছে।
সংকট আরও তীব্র হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে বাধার কারণে। কাতার থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ এলএনজি না পাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে বেশি দামের স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন, টার্মিনাল ও রিগ্যাসিফিকেশন ব্যয় এবং ডলারের চাপ।
ভর্তুকিতে লাফ
গত অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির জন্য প্রথমে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবেই প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা—আগের বছরের চূড়ান্ত ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ।
চাপের মাত্রা বোঝা যায় অর্থবছরের শুরুতেই। প্রথম দুই মাসে গ্যাস খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একদিকে দাম, অন্যদিকে ভর্তুকি
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি দামে গ্যাস কিনেও দেশের ভোক্তাদের ওপর পুরো ব্যয় চাপিয়ে দিতে পারছে না সরকার। ফলে আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পূরণ করতে বাড়ছে ভর্তুকি। এতে পেট্রোবাংলার আর্থিক চাপও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘ হলে এই ব্যয় শুধু গ্যাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত এসে পড়তে পারে বাংলাদেশের বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সামনে বড় পরীক্ষা
সরকার ইতোমধ্যে অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম অস্থির থাকলে শুধু আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া কঠিন।
এ অবস্থায় দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি শক্তিশালী করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘ হয়, এলএনজির আগুন শুধু জ্বালানি বিলেই নয়—সরকারের ভর্তুকির খাতেও বড় আগুন ধরাতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















