কাগজে সারের ঘাটতি নেই। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। অথচ জমিতে সার দেওয়ার সময়ে কৃষককে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে ডিলারের দরজায়।
নির্ধারিত দামে না পেলেও বেশি টাকা দিলে সেই সারই মিলছে খোলাবাজারে। শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে সার নিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা।
আইনের ভাষায় এটি গুদাম ভাঙা ও অনুমতি ছাড়া পণ্য নিয়ে যাওয়া। কিন্তু কৃষি ব্যবস্থাপনার ভাষায় ঘটনাটি আরও বড় কিছুর লক্ষণ—জাতীয় পর্যায়ে মজুদ থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে সার পৌঁছানোর ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না। বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিক্রির হিসাবের মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকেছে অনিয়ম, অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক।
ঘটনার পর গঠিত সরকারি তদন্ত কমিটিও কৃষকদের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি। তদন্তে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে সময়মতো সার না দেওয়া এবং বিক্রির ক্যাশ মেমোতে অসংগতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডিলার প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে প্রশাসন।
ফলে ভূরুঙ্গামারীর ঘটনাকে শুধু ‘উত্তেজিত কৃষকদের লুটপাট’ বলে শেষ করার সুযোগ নেই। একইভাবে আইন ভাঙাকে কৃষকের অসহায়তার নামে বৈধতা দেওয়ারও সুযোগ নেই। আসল প্রশ্ন হলো, একজন কৃষককে কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হলো, যেখানে সরকারি ব্যবস্থার বদলে গুদামের দরজা ভাঙাকেই তার কাছে সার পাওয়ার শেষ পথ বলে মনে হয়েছে?
কী ঘটেছিল ভূরুঙ্গামারীতে
২৩ আগস্ট সকালে ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের ডিলার পয়েন্টে সার কিনতে জড়ো হন দুই শতাধিক কৃষক। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে ঘুরেও তারা সার পাচ্ছিলেন না। সেদিনও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বিক্রি শুরু না হওয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কৃষকেরা গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যান।
ঠিক কত বস্তা সার নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রথম দিকের প্রতিবেদনে একাধিক সংখ্যা এসেছে—১৬৭, ১৯৭, ২০২ এবং ২২৫ বস্তা। তবে পরে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গুদাম থেকে ২২৫ বস্তা সার নেওয়া হয়েছিল। এই সংখ্যাগত পার্থক্যটিও প্রশাসনিক নথি ও তাৎক্ষণিক হিসাবের দুর্বলতার পরিচয় দেয়।
ঘটনার পর কিছু সার উদ্ধার করা হয়। ডিলার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এবং প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি প্রত্যক্ষদর্শী, কৃষক ও ডিলারের বক্তব্য নিয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কৃষকদের সময়মতো সার দেওয়া হয়নি এবং ডিলারের ক্যাশ মেমোতে অসংগতি ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ‘কৃষকের অযৌক্তিক আতঙ্ক’ দিয়ে ঘটনার পুরো ব্যাখ্যা মেলানো যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটির ফলাফল
বরাদ্দের অঙ্কেই ছিল সংঘাতের বীজ
স্থানীয় পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিলখুড়ি ইউনিয়নে সারের চাহিদা ছিল প্রায় চার হাজার বস্তা। বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩২০ বস্তা। অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে যে চাহিদার হিসাব করা হয়েছিল, বরাদ্দ ছিল তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, আগস্টে পুরো ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ৬৮০ টন ইউরিয়ার চাহিদা ছিল এবং সেই পরিমাণই বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তার দাবি, উপজেলায় সারসংকট নেই।
দুই বক্তব্য পাশাপাশি রাখলেই সমস্যাটি পরিষ্কার হয়। উপজেলা পর্যায়ে মোট বরাদ্দ চাহিদার সমান হলেও নির্দিষ্ট ইউনিয়ন, ডিলার পয়েন্ট কিংবা কৃষকের হাতে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সার না-ও পৌঁছাতে পারে। জাতীয় বা উপজেলা পর্যায়ের মোট মজুদ মাঠের প্রাপ্যতার নিশ্চয়তা নয়। গুদামের হিসাব আর কৃষকের জমি এক জায়গা নয়—মাঝখানে রয়েছে বরাদ্দ, পরিবহন, উত্তোলন, ডিলার, খুচরা বিক্রি ও তদারকির দীর্ঘ শৃঙ্খল। এর যেকোনো একটি ধাপ ভেঙে পড়লেই কাগজে উদ্বৃত্ত সার মাঠে সংকটে পরিণত হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত প্রতি বস্তা ইউরিয়ার দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন। অভিযোগটি স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা প্রয়োজন। তবে তদন্তে ক্যাশ মেমোর অসংগতি পাওয়ায় বিক্রি ও হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সংকট সারের, নাকি বিতরণব্যবস্থার
কৃষি মন্ত্রণালয় ১৬ আগস্ট জানিয়েছিল, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এই দাবি সত্য হলেও ভূরুঙ্গামারীর পরিস্থিতির সঙ্গে তার বিরোধ নেই। কারণ একটি দেশে যথেষ্ট সার থাকতে পারে, অথচ নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় কৃষক সেই সার না-ও পেতে পারেন।
এটি মূলত তিন স্তরের সংকট।
প্রথমত, স্থানীয় চাহিদা নির্ধারণে দুর্বলতা। একই উপজেলার সব ইউনিয়নে জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন এবং সার প্রয়োগের সময় এক নয়। আগের বছরের বিক্রিকে যান্ত্রিকভাবে ভিত্তি ধরে বরাদ্দ দিলে কোনো এলাকায় উদ্বৃত্ত এবং অন্য এলাকায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বরাদ্দ ও উত্তোলনের মধ্যে ফাঁক। সরকারি বরাদ্দ হওয়া মানেই সার ডিলারের দোকানে পৌঁছানো নয়। কোথাও ডিলার দেরিতে সার তোলেন, কোথাও পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়, আবার কোথাও মজুদ রেখে ধাপে ধাপে বিক্রি করা হয়। এই পর্যায়ে নজরদারি দুর্বল হলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ থাকে।
তৃতীয়ত, শেষ ধাপের বিক্রিতে অস্বচ্ছতা। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কোন দিনে কত বিক্রি করলেন এবং কার কাছে বিক্রি হলো—এই তথ্য কৃষকের সামনে দৃশ্যমান নয়। তথ্য গোপন থাকলে গুজব দ্রুত ছড়ায়। কৃষক মনে করেন, আজ না নিলে কাল আর পাবেন না। তখন স্বাভাবিক চাহিদার সঙ্গে আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদাও যুক্ত হয়।
ভূরুঙ্গামারীতে ঠিক এই তিনটি উপাদানের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে—চাহিদার তুলনায় কম স্থানীয় বরাদ্দের দাবি, সময়মতো বিক্রি না করার অভিযোগ এবং ক্যাশ মেমোতে অসংগতি।
কৃষকের অতিরিক্ত ব্যবহারও বাস্তব, তবে সেটি পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়
কৃষি কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, অনেক কৃষক অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করেন। দাবিটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশ না মেনে ধান ও আলুতে অতিরিক্ত ইউরিয়া, টিএসপি বা এমওপি ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা ও সরকারি সতর্কতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অনেক কৃষক সুপারিশের তুলনায় বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা, পুষ্টির ভারসাম্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের সার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন
কিন্তু এই প্রবণতা দিয়ে ভূরুঙ্গামারীর অনিয়ম ঢাকা যায় না। কৃষক বেশি সার চাইছেন কি না, সেটি কৃষি সম্প্রসারণ ও মাঠপর্যায়ের তথ্য দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে। ডিলার সার আটকে রাখবেন, ক্যাশ মেমোতে অসংগতি থাকবে, আবার দায় দেওয়া হবে শুধু কৃষককে—এটি তদন্ত নয়, দায় সরানোর পুরোনো প্রশাসনিক কসরত।
সুষম সার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, মাটির পরীক্ষা ও ফসলভিত্তিক পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার। কৃষক যদি বছরের পর বছর ভুল মাত্রায় সার প্রয়োগ করেন, সেটিও রাষ্ট্রীয় সম্প্রসারণসেবার সীমাবদ্ধতার প্রমাণ।
সামনে বড় পরীক্ষা বোরো ও রবি মৌসুম
আমনের বর্তমান সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন স্থানীয় ঘটনা মনে করার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বোরো ও রবি মৌসুমে দেশের সারের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। সরকারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশের বেশি বোরো ও রবি মৌসুমে ব্যবহৃত হয়।
তাই ‘বোরোতে মোট সারের ঠিক ৬০ শতাংশ লাগে’—এমন নির্দিষ্ট দাবি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক হিসাবে বোরো ও রবি মিলিয়ে ব্যবহার ৭০ শতাংশের বেশি; শুধু বোরোর অংশ আলাদা করে নিশ্চিত করার মতো প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
এখন যদি ইউনিয়নভিত্তিক চাহিদা, ডিলারের উত্তোলন এবং কৃষকের কাছে বিক্রির হিসাব ঠিক করা না হয়, তবে বোরোর সময় একই সমস্যা অনেক বড় পরিসরে দেখা দিতে পারে। বোরো বাংলাদেশের প্রধান ধান ফসল। এর উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চালের বাজার, সরকারি খাদ্য মজুদ, আমদানির প্রয়োজন এবং মূল্যস্ফীতিতেও চাপ পড়বে।
বৈশ্বিক বাজারও স্বস্তিতে নেই
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার করে এবং ইউরিয়াসহ প্রধান সারের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। এমওপির ক্ষেত্রে দেশ সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, জাহাজ চলাচল, রপ্তানিকারক দেশের নীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি সরাসরি দেশের কৃষিতে প্রভাব ফেলে।
চীন ২০২৬ সালে ডিএপি, এমএপি এবং কয়েক ধরনের ফসফেট সার রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েছে। তবে ‘চীন সব ধরনের সার রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করেছে’ বলা অতিরঞ্জিত হবে। বিধিনিষেধ পণ্যভেদে আলাদা এবং বিশেষ করে ফসফেট সারে বেশি কঠোর। তা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া ও দাম বাড়ার ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য বাস্তব। চীনের রপ্তানি বিধিনিষেধ নিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদন
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (নোয়া) বলছে, ২০২৬ সালের শেষ ভাগে এল নিনো খুব শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃষ্টিপাত ও কৃষিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এল নিনো মানেই বাংলাদেশে নিশ্চিতভাবে উৎপাদন ধস—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক নয়। এর প্রভাব অঞ্চল, সময় ও স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে।
একই কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কার খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে তুলনা করাও দুর্বল বিশ্লেষণ। শ্রীলঙ্কার সংকটে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, ঋণ, রাজস্বনীতি এবং আকস্মিক রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করাসহ একাধিক কারণ কাজ করেছিল। বাংলাদেশে ঝুঁকি আছে, কিন্তু এখনই ‘শ্রীলঙ্কার পথে’ বলা তথ্যের চেয়ে আতঙ্ক বেশি বিক্রি করবে। বাজারে আতঙ্কের জোগান যথেষ্ট; সাংবাদিকতার কাজ তাতে ভর্তুকি দেওয়া নয়।
ঘটনাটি কী বার্তা দিচ্ছে
ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা প্রথমত জানাচ্ছে, সরকারের কেন্দ্রীয় মজুদের হিসাব দিয়ে মাঠের বাস্তবতা বোঝা যায় না। দ্বিতীয়ত, ডিলারভিত্তিক বিতরণব্যবস্থায় জবাবদিহি ও তথ্যপ্রকাশ দুর্বল। তৃতীয়ত, কৃষকের আস্থা একবার ভেঙে গেলে প্রকৃত ঘাটতির আগেই আতঙ্কজনিত সংকট তৈরি হতে পারে। চতুর্থত, এখনকার অনিয়ম দ্রুত নিয়ন্ত্রণ না করলে বোরো মৌসুমে তা খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তবে একটি ঘটনা দিয়েই দেশজুড়ে সংঘবদ্ধ কালোবাজারি প্রমাণ করা যায় না। সেটি জানতে বিভিন্ন জেলার বরাদ্দ, উত্তোলন, বিক্রি, বাজারদর এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। ভূরুঙ্গামারী আপাতত একটি নিশ্চিত সতর্কসংকেত; এটি জাতীয় প্রবণতার প্রমাণ কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয়।
এখন কী করা দরকার
প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রতিটি ইউনিয়নে ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ, উত্তোলন, দৈনিক মজুদ ও বিক্রির তথ্য প্রকাশ করা। দোকানের সামনে তালিকা টাঙানোর পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট বা অনলাইন ড্যাশবোর্ডে তা দিতে হবে।
কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা কৃষক কার্ডের ভিত্তিতে বিক্রির ডিজিটাল রেকর্ড রাখা গেলে একই ব্যক্তির নামে অতিরিক্ত সার তোলা এবং ভুয়া ক্যাশ মেমো—দুটিই কমানো সম্ভব। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থা যেন প্রকৃত কৃষকের জন্য নতুন আমলাতান্ত্রিক বাধা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় চাহিদা ও বরাদ্দের বড় ব্যবধান থাকলে দ্রুত পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে ডিলারের গুদামের বাস্তব মজুদ নিয়মিত যাচাই, অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত এবং প্রমাণিত অনিয়মে লাইসেন্স স্থগিত করতে হবে।
বোরো ও রবি মৌসুম সামনে রেখে আমদানি চুক্তি, জাহাজীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ এবং দেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি এখন থেকেই পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আশুগঞ্জসহ গ্যাসের অভাবে বন্ধ বা কম উৎপাদনে থাকা কারখানা চালুর প্রশ্নও জ্বালানি বরাদ্দের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে সমাধান করতে হবে।
সবশেষে, কৃষকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ডিলার ও তদারকি কর্তৃপক্ষের দায়ও সমানভাবে তদন্ত করতে হবে। শুধু গুদামের ভাঙা বেড়া মেরামত করলে হবে না; যে ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা কৃষকদের ওই বেড়া ভাঙার জায়গায় নিয়ে গেছে, সেটিও মেরামত করতে হবে।
ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা শুধু কয়েকশ বস্তা সার নিয়ে যাননি। তারা দেশের কৃষি বিতরণব্যবস্থার ওপর জমে থাকা অনাস্থার দরজাটিও ভেঙে দেখিয়ে দিয়েছেন। সরকার সেই দৃশ্যকে অপরাধের আলোকচিত্র হিসেবে দেখবে, নাকি আসন্ন খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের আগাম সতর্কতা হিসেবে নেবে—এখন মূল প্রশ্ন সেটিই।
